ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পেরিয়ে গেছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বলার মতো সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এমন অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বকে আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ফের শান্তি আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে তেহরান নতুন প্রস্তাব দিলেও শুক্রবার ট্রাম্প তা তড়িঘড়ি নাকচ করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে রোববার আবার নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এনিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের প্রস্তাব খতিয়ে দেখছেন। যদিও তিনি জানান, নতুন এই প্রস্তাবেও মনে হয় না তিনি সন্তুষ্ট হবেন।
দুই পক্ষই এখনো নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও অনড় অবস্থান ধরে রেখেছে। কেউ তাদের দাবি থেকে তেমন পিছু হটছে না। এতে উত্তেজনা কমার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকার পরিণতি ভয়াবহ। এমন অমীমাংসিত সংঘাতের অর্থ, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের উচ্চমূল্যসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে এশিয়ার বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। একাধিক দেশ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।
এ ছাড়া এই অচলাবস্থা জনপ্রিয়তা কমিয়ে আসা ট্রাম্পের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে এবং আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী কংগ্রেসীয় নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সম্ভাবনাকে আরও ম্লান করে দেবে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে ট্রাম্পের প্রতি আস্থা রাখা মার্কিনিদের সংখ্যা ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন এখন পর্যন্ত তার বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন থেকে শুরু করে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ করতে পারেনি।
গত মাসে ট্রাম্প মার্কিন প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করার পর থেকে আরও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার শঙ্কা বেড়েছে। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম এশিয়া বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, বিশ্বকে আগের তুলনায় কম নিরাপদ করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে মনে রাখা হবে।
গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে ‘সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী’ হামলা এবং হরমুজ প্রণালির কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রস্তুতির কথা ট্রাম্পকে জানিয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা মনে করছেন, এমন অচলাবস্থা এবং নৌ-অবরোধই লম্বা সময় বহাল থাকতে পারে।অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল পার হতো। তবে এই প্রণালির টুঁটি চেপে ধরায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, তেহরানের বিশ্বাস তারা যেকোনো সময় প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়ার সক্ষমতা রাখে। তাদের অবস্থা যদি খারাপও হয় তাও তারা প্রণালিটির ওপর তাদের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে।
এমন অবস্থা চলতে থাকলে এতে করে পুরো বিশ্বকে আরও বেশি ভুগতে হবে। এ ছাড়া বিশ্লেষকদের অনেকেই সতর্ক করে বলেন, স্থায়ী সমাধান না এলে পশ্চিম এশিয়ার এ সংঘাত ‘সুপ্ত’ অবস্থায় চলে যেতে পারে। এমন হলে ট্রাম্প ওই অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মার্কিন সেনা সরাতেও পারবেন না।
এর প্রভাব পড়বে বিশ্বের অন্যত্র। এতে এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানেই ওয়াশিংটনের গুরুত্ব আরও কমবে।
পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল গভীর হয়েছে। রয়টার্স বলছে, ট্রাম্প যে নানামুখী চাপে রয়েছে, তা হয়তো ইরান উপভোগই করছে।