Image description

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা বা ডেডলাইন কি যুদ্ধবিরতির কারণে পিছিয়ে গেছে? ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এমন দাবিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তেহরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির ফলে কংগ্রেসের সবুজ সংকেত পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ১ মে’র সময়সীমাটি এখন আর কার্যকর নয়। তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাখ্যাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মার্কিন ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসকে যুদ্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন, তবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে তাকে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন নিতে হয়। অন্যথায় ওই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে প্রেসিডেন্ট বাধ্য থাকেন।

ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা আগামী শুক্রবার (১ মে) শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেন, বর্তমানে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির কারণে এই ডেডলাইনের ‘ঘড়ি’ আপাতত থমকে গেছে।

সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির শুনানিতে হেগসেথ বলেন, ‘লড়াই সাময়িক বন্ধ থাকলে ৬০ দিনের সময়সীমাও থেমে যায় বা স্থগিত থাকে।’ তার মতে, গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি বড় কোনো হামলা না হওয়ায় যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে এবং এর ফলে আইনি বাধ্যবাধকতাও শিথিল হয়েছে।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৭ এপ্রিলের পর মার্কিন বাহিনী ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেনি। তাই ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা কার্যত সমাপ্ত হয়েছে।

এদিকে, আইনি জটিলতা এড়াতে অভিযানের নাম বদলে ফেলার মতো চতুর কৌশলও আলোচনা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক পরিচালক রিচার্ড গোল্ডবার্গ পরামর্শ দিয়েছেন, বর্তমান অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পরিবর্তে একটি নতুন নাম যেমন ‘এপিক প্যাসেজ’ দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তার মতে, নতুন মিশনকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না।

তবে মার্কিন সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সহযোগী উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইন ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাখ্যাকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছেন।  তিনি বলেন, ‘যুদ্ধক্ষমতা আইনের কোথাও বলা নেই যে যুদ্ধবিরতি চললে ৬০ দিনের সময়সীমা থেমে যাবে। এ ধরনের ব্যাখ্যা আইনটিকে একটি ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত করবে।’

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন কংগ্রেসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণার অনুমতি চাচ্ছেন না? কারণ তিনি জানেন, ভোট হলে তিনি হেরে যাবেন। উল্লেখ্য, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র যুদ্ধক্ষমতা খর্ব করতেই ১৯৭৩ সালে এই আইন পাস হয়েছিল।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন এবং অ্যাডাম শিফ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই যুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অ্যাডাম শিফ বলেন, ‘আকাশপথে হামলা বন্ধ মানেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। হরমুজ প্রণালীতে এখনো উত্তেজনা চলছে। কিছু বাহিনী ব্যবহার বন্ধ রাখা মানে ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে দেওয়া নয়।’

গত ২০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পতাকাবাহী ‘তুসকা’ নামক একটি জাহাজ জব্দ করে, যার পাল্টা হিসেবে ইরানও দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ আটক করেছে। এই পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। মেইন অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ‘কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অসীম নয়। ৬০ দিনের সময়সীমা কোনো পরামর্শ নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।’

বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গভীর বিভাজনের ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের কোনো স্থায়ী অনুমোদন পাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শুক্রবারের ডেডলাইন পার হওয়ার পর হোয়াইট হাউস আইনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কীভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।