ভারতে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। গত শুক্রবার দীর্ঘ বিতর্কের পর ভোটাভুটিতে গেরে গেছে ‘সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ২০২৬’। বিলটি পাসের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট। লোকসভায় বিলটির পক্ষে ২৯৮ ভোট পড়লেও বিপক্ষে পড়েছে ২৩০ ভোট। ফলে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক ফিগার’ ৩৫২ থেকে অনেক দূরেই থেমে যেতে হয়েছে মোদী সরকারকে।
নারী আসনের আড়ালে নির্বাচনি মানচিত্র বদলের ছক?
২০২৩ সালে নারী সংরক্ষণ বিল পাস হলেও তা কার্যকর করার জন্য ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত বিলে একটি নতুন শর্ত জুড়ে দেয় সরকার। সেটি হলো—নির্বাচনি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ‘ডিলিমিটেশন’। প্রস্তাব অনুযায়ী, লোকসভার বর্তমান ৫৪৩টি আসন বাড়িয়ে ৮৫০ করার পরিকল্পনা ছিল, যার ভিত্তি হতো জনসংখ্যা। সরকারের দাবি, এই বর্ধিত আসনেই নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন নিশ্চিত করা হবে।
তবে বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। রাহুল গান্ধী সরাসরি অভিযোগ করেন, ‘এটি নারী সংরক্ষণ বিল নয়, বরং দেশের নির্বাচনি মানচিত্র পরিবর্তন করার একটি প্রচেষ্টা।’
বিরোধীদের যুক্তি হলো, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উত্তর ভারতে বেশি এবং দক্ষিণ ভারতে কম। ফলে ডিলিমিটেশন হলে উত্তর ভারতের আসন সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েও পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।
কেন এত তড়িঘড়ি?
বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, ২০২৬-২৭ সালের আদমশুমারি যখন চলমান, তখন কেন সরকার দ্রুত এই বিল পাস করতে চাইলো? ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মতে, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। তিনি বিরোধীদের অভিযুক্ত করে বলেন, ‘ইন্ডিয়া জোট নানা অজুহাতে নারী সংরক্ষণের বিরোধিতা করছে। তারা মা-বোনদের রোষ থেকে রেহাই পাবে না।’
অমিত শাহ আরও দাবি করেন, বড় নির্বাচনি আসনগুলোতে একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ অপরিহার্য। তিনি কংগ্রেসকে আক্রমণ করে বলেন, তারা ওবিসি বা অনগ্রসর শ্রেণিকে কেবল ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিজেপি একজন অনগ্রসর শ্রেণির নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে।
বিরোধীদের অনড় অবস্থান
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা নারী সংরক্ষণের পক্ষে হলেও সেটিকে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ঘোর বিরোধী। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন ডিলিমিটেশনের বিরোধিতায় রাজ্যবাসীকে কালো পতাকা তোলার ডাক দিয়েছেন।
ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি পার্লামেন্টে বলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার অপরাধে দক্ষিণ ভারতকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। শশী থারুরের মতে, উন্নততর শাসনের ফলে যদি রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়, তবে সেটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ভুল বার্তা দেবে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
এই বিল পাস না হওয়ায় মোদী সরকার বাকি দুটি সংশোধনী বিল—ডিলিমিটেশন বিল ২০২৬ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সম্পর্কিত বিল—প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ২০২৯ সালের নির্বাচনে নারীদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর হওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো। মোদী সরকার এই ব্যর্থতার জন্য বিরোধীদের ‘নারীবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেও বিরোধী দলগুলো একে ‘ফেডারেল কাঠামো’ রক্ষার জয় হিসেবে দেখছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা