Image description

ক্যাথলিক নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তার কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিশ্রুতি সমর্থকরা সানন্দে গ্রহণ করলেও, গির্জার নেতারা সেটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন। 

তবে, গত কয়েক মাস ধরে এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক গির্জার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডানপন্থী সাধারণ ক্যাথলিক অনুসারীদের এক ধরণের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

পোপ লিও-কে আক্রমণ করে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং নিজেকে যিশুর মতো তুলে ধরে একটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ছবি শেয়ার করার পর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।  

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এবার সমালোচনা আসছে ট্রাম্পের খুব বিশ্বস্ত ও রক্ষণশীল ক্যাথলিক মিত্রদের কাছ থেকেই। তারা শুধু পোপ লিওর সঙ্গে ট্রাম্পের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে অখুশি নন, তাদের এই ক্ষোভের শেকড় লুকিয়ে আছে ইরান যুদ্ধ ঘিরে।

আমেরিকান বংশোদ্ভূত প্রথম পোপকে 'অতিরিক্ত উদার' এবং 'অপরাধ দমনে দুর্বল' আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লম্বা পোস্ট দেন ট্রাম্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সেই এআই ছবি। ছয় সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অনেক রক্ষণশীল ক্যাথলিকের মতাদর্শে যে পরিবর্তন আসছিল, ট্রাম্পের এই আচরণ যেন তাতে সমর্থনই জুগিয়েছে। 

'বোমা ফেলাকে ধর্মের নামে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না'  

বিশপ জোসেফ স্ট্রিকল্যান্ড বলেন, 'আমি প্রার্থনা করি, মানুষের কাছে যেন এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে আমরা কোনো জাতীয় নেতার দিকে তাকিয়ে নেই। যার সবচেয়ে বেশি টাকা বা অস্ত্র আছে, আমরা তার ওপর নির্ভর করি না। আমরা যিশুর ওপর নির্ভর করি।' 

এই কথাগুলো এমন এক ব্যক্তির মুখ থেকে এসেছে, যিনি গত বছরই ট্রাম্পের মার-এ-লাগো বাসভবনকে 'পবিত্র' করার এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে একটি কনফারেন্সে মূল বক্তব্য দিয়েছিলেন এই স্ট্রিকল্যান্ড। সেই অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন প্রধান অতিথি। ২০২০ সালে নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিতে ট্রাম্প সমর্থকদের এক পদযাত্রায়ও ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। 

সব সময় ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থক ছিলেন স্ট্রিকল্যান্ড। রাজনীতিতে তার এই প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা এবং প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে খোলাখুলি বিরোধের কারণেই টেক্সাসের টাইলারের বিশপ পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছিল। 

অথচ ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউস এবং ভ্যাটিকানের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানের এই সময়ে বিশপ স্ট্রিকল্যান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গ ছেড়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, 'আমি মনে করি না, এটি কোনো ন্যায়সংগত যুদ্ধ। আমি সম্মানীয় পোপ এবং শান্তির পক্ষে আছি। এটা কোনো রাজনীতির বিষয় নয়। এটি নৈতিক সত্যের বিষয়।' 

শুধু তাই নয়, যুদ্ধ পরিচালনায় হোয়াইট হাউসের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে অন্য ক্যাথলিকদেরও একই কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশপ স্ট্রিকল্যান্ড বলেন, 'অনৈতিক আচরণকে যৌক্তিক দেখাতে যখন ধর্মকে ব্যবহার করা হয়, তখন তা এক অন্ধকার সময়ের নির্দেশ করে। বিশেষ করে বোমা ফেলাকে ন্যায্যতা দিতে ধর্মের ব্যবহার আমাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী।'  

পোপ লিও-কে আক্রমণ এবং নিজেকে 'এআই যিশু' হিসেবে তুলে ধরার বিষয়ে (যেটিকে ট্রাম্প চিকিৎসক ভেবেছিলেন বলে দাবি করেছেন) বিশপ স্ট্রিকল্যান্ড বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গসপেল অব ম্যাথিউ-এর কথা মনে করিয়ে দেওয়া তিনি তার দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি এমন একটি অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে—সর্বোচ্চ ক্ষমতা খ্রিষ্টের হাতে, কোনো মানুষের হাতে নয়। 

তিনি বলেন, 'বিশ্বনেতারা যখন এই সত্য ভুলে যান, তখন সবাই বিপদে পড়ে।' 

রাজনৈতিক সমীকরণ 

রক্ষণশীল ক্যাথলিকদের এই মনবদল মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই গোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। তবে এই পুরো বিষয়টি বেশ জটিল। 

এখানে জাতিগত পরিচয়ও বড় ভূমিকা রেখেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, শ্বেতাঙ্গ ক্যাথলিকদের ৬২ শতাংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এবং ৩৭ শতাংশ কমলা হ্যারিসকে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে, হিস্পানিক ক্যাথলিকদের ৪১ শতাংশ ট্রাম্পকে এবং ৫৮ শতাংশ হ্যারিসকে ভোট দিয়েছেন। 

সামগ্রিকভাবে ক্যাথলিকদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির দিকে ঝোঁকার প্রবণতা থাকলেও, সেখানে স্পষ্ট বিভাজনও রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ধর্ম বিষয়ক গবেষণার জ্যেষ্ঠ সহযোগী পরিচালক গ্রেগ স্মিথ বলেন, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অনেক মার্কিন ক্যাথলিকের কাছে বিশ্বাসের চেয়ে রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মূলত দলীয় মতাদর্শেই তারা বিভক্ত।  

পোপকে নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এর প্রমাণ মেলে। পিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, রিপাবলিকান ক্যাথলিকদের চেয়ে ডেমোক্র্যাট ক্যাথলিকদের কাছে পোপ ফ্রান্সিস বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। তবে বর্তমান পোপ লিও দুই পক্ষের কাছেই সমান জনপ্রিয়। পোপ ফ্রান্সিসকে অনেকেই একজন স্বতঃস্ফূর্ত প্রগতিশীল নেতা হিসেবে দেখতেন। 

'পোপ শুধু রাষ্ট্রপ্রধান নন, খ্রিষ্টের প্রতিনিধি'

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক 'ডানপন্থীদের' অন্যতম পরিচিত মুখ এবং ফ্যামিলি ইনস্টিটিউট অব কানেকটিকাটের নির্বাহী পরিচালক পিটার উলফগ্যাং বলেন, পোপও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন।  

তিনি বলেন, 'পোপ তো পোপই, তাকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আমি মনে করি না যে, ক্যাথলিক ধর্ম অন্ধ আনুগত্য চায়। আমরা চিন্তাশীল মানুষ।' 

উলফগ্যাং একসময় বেশ ভেবেচিন্তে, সতর্কতার সাথে ট্রাম্পকে সমর্থন করতেন। তবে পরে তিনি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকে পরিণত হন। তিনি ট্রাম্পের অভিবাসী বিতাড়ন নীতি এবং জেডি ভ্যান্সের 'ক্যাথলিক জাতীয়তাবাদ' ব্র্যান্ডের একজন কড়া সমর্থক। কিন্তু এখন তিনি পোপ লিওর প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণের ঘোর সমালোচক।   

উলফগ্যাং বিবিসিকে বলেন, 'ক্যাথলিক ধর্ম কীভাবে কাজ করে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা বোঝেন না। পোপ শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধান নন, তিনি পৃথিবীতে খ্রিষ্টের প্রতিনিধি। তাকে আক্রমণ করার অর্থ হলো গির্জাকেই আক্রমণ করা। তিনি পোপকে যত আক্রমণ করবেন, ক্যাথলিক ভোটারদের কাছে তার সমর্থন তত কমবে।'

পিটার উলফগ্যাং দাবি করেন, তার বিশ্বাসই তাকে মার্কিন ক্যাথলিক বিশপদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল, যখন ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করছিলেন তারা। আবার সেই একই বিশ্বাস আজ তাকে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করতে বাধ্য করছে। 

তিনি বলেন, 'যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করার কথা বলেন, বা প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এমন এক রক্তপিপাসু প্রার্থনা করেন যা ক্যাথলিকদের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা, তখন রক্ষণশীল ক্যাথলিকদের পোপ লিওর পাশে দাঁড়ানোটা খুবই স্বাভাবিক।' 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার পরপরই পেন্টাগনের এক প্রার্থনা অনুষ্ঠানে একটি বিতর্কিত প্রার্থনা পাঠ করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সেখানে তিনি 'ভয়ংকর সহিংসতা' এবং 'দ্রুত ও অনুশোচনাহীন বিচার' কার্যকর করার কথা বলেন। 

'ডান ও বামপন্থী' ক্যাথলিকদের ঐক্য   

পিটার উলফগ্যাং তার লেখায় প্রায়ই ক্যাথলিক 'বামপন্থীদের' কঠোর সমালোচনা করেন। কিন্তু তিনি মনে করেন, ইরান ইস্যু বেশ কয়েকটি উপদলকে একত্র করেছে। এর অন্যতম কারণ হলো পোপের স্পষ্ট যুদ্ধবিরোধী বার্তা। 

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শীর্ষ ক্যাথলিক যাজক প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করেননি। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র উইনোনা-রচেস্টারের বিশপ রবার্ট ব্যারনও পোপকে আক্রমণ করে কথা বলার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। যদিও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ক্যাথলিক গির্জার উদারপন্থী অংশের নেতা ও বিশিষ্ট ভাষ্যকার স্টিভেন গ্রেইডানাসও এই বিরল ঐক্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, হোয়াইট হাউস কর্তৃক 'ন্যায়সংগত যুদ্ধ তত্ত্ব' (যা কখন এবং কীভাবে যুদ্ধ করা উচিত তা নির্ধারণ করে)—লঙ্ঘন করাই এর পেছনের অন্যতম কারণ। 

গ্রেইডানাস বলেন, 'পোপ লিওকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আক্রমণের ধরনে আমি ব্যথিত। তবে অন্যভাবে দেখলে, আমি খুশি যে ক্যাথলিকরা কার পক্ষে দাঁড়াবেন, সেই পথটি স্পষ্ট হয়েছে।' 

কী বলছে ভ্যাটিকান?

ভ্যাটিকান শুরু থেকেই এই অবস্থান ধরে রেখেছে যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আমরা যা দেখছি, তা মোটেই পোপ লিও এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লড়াই নয়। বরং পোপ তার বিশ্বাস থেকে এই যুদ্ধের যুক্তিগুলোর বিরোধিতা করছেন।   

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানে 'পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার' কথা বলেন, তখন পোপ সরাসরি এর জবাব দিয়েছেন। তিনি এই হুমকিকে 'পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ভ্যাটিকানের সংস্কৃতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি রেভারেন্ড আন্তোনিও স্পাদারো বলেন, 'কোনো ব্যক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা এবং যে নীতির কারণে যুদ্ধ বাঁধে তাকে চ্যালেঞ্জ করার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।' 

পোপ লিওর যুদ্ধবিরোধী বার্তাকে ঘিরে বাম ও ডানপন্থী মার্কিন ক্যাথলিকদের এই এক হওয়াকে ভ্যাটিকান সিটি কীভাবে দেখছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রেভারেন্ড স্পাদারো বলেন, 'তিনি অবশ্যই সবাইকে এক ছাতার নিচে আনতে পারেননি। কিন্তু পোপ লিও ক্যাথলিকদের জন্য এই বিতর্ককে নিছক দলীয় রাজনীতির বৃত্ত থেকে বের করে আনতে পেরেছেন।'