Image description

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্য দিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

উত্তর আমেরিকার সময় সাতই এপ্রিল রাত আটটার মধ্যে ওই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া না হলে ইরানে আরও বড় ধরনের হামলা চালানোর হুমকি দেন তিনি।

"আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না। আমি চাই না এটা ঘটুক, কিন্তু সম্ভবতঃ তা ঘটবে," মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন ট্রাম্প।

তার এই হুমকির পর ইরানিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার ভয়ে তারা মঙ্গলবার সারাটা রাত প্রায় নির্ঘুম কাঁটিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় আল্টিমেটামের সময় শেষ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।

"আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে," বলেন মি. শরীফ।

যুদ্ধবিরতির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করার জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য উভয়পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান, উভয়পক্ষ নিজেদের বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছে। ইসরায়েলও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দিয়েছে।

যুদ্ধ থামানোর জন্য ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় দশটি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প গত মাসেই ১৫টি শর্ত তুলে ধরে সেগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ইরানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক কোন শর্তগুলোতে তারা একমত হয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেন?

ইরানের দশ শর্ত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগে ইরানের পক্ষ থেকে কাছে ১০টি শর্ত উপস্থাপন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।

"পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া দশ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে," সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন ট্রাম্প।

ইরানের সরকারি গণমাধ্যমে ১০টি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো হলো:

১. ইরানে ফের হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা প্রদান।

২. হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকা।

৩. ইরানে পরমাণু সমৃদ্ধিকরণের অনুমতি প্রদান।

৪. ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৫. ইরানের ওপর থেকে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৬. ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া সকল প্রস্তাব প্রত্যাহার।

৭. আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রস্তাবগুলোও বাতিল করা।

৮. ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

৯. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।

এবং

১০. লেবানন সহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।

ইরানের গণমাধ্যমের দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত মেনে নিয়েছে। যদিও সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে যে উভয়পক্ষ রাজি হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রতিবদ্ধ হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।

ইরানে যতটুকু পরমাণু সমৃদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো 'যথোপযুক্তভাবে সেগুলো দেখভালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে' বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

"সেটা নাহলে আমি মীমাংসা করতাম না," যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর বার্তাসংস্থা এএফপি'কে বলেছেন ট্রাম্প।

তবে ইরানের ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।

যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে চীনও ভূমিকা রেখেছে বলে জানতে পেরেছেন ট্রাম্প।

কী আছে ট্রাম্পের পরিকল্পনায়?

মার্চের শেষদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়ে সেগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ইরানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যদিও ইরান তখন সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্ত যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইরান সরকারের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউজ।

সেখানে ইরানের দশ দফা শান্তি প্রস্তাবের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের সেই পরিকল্পনাটি প্রকাশ করা হয়নি।

তবে জানা যাচ্ছে, সেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইরানের নেতারা ট্রাম্পের দাবি গুলোকে 'বাড়াবাড়ি' বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের শর্তের জবাবে পরে যুদ্ধের 'স্থায়ী অবসানে'র লক্ষ্যে দশ দফার প্রস্তাবটি পাঠায় তেহরান।

সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনার জন্য' দশই এপ্রিল ইসলামাবাদে একটি বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান।

সেখানে উভয়পক্ষের প্রতিনিধি দলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শাহবাজ শরীফ।

ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে 'শান্তি ও স্থিতিশীলতা' ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।

"আমরা আন্তরিকভাবে আশাকরি, 'ইসলামাবাদ আলোচনা' টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে এবং সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে আরও সুসংবাদ জানাতে চাই," বলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।

যদিও আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত তাতে কতটা সফলতা আসবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এরকম আলোচনা হতে দেখা গেলেও মতানৈক্য না হওয়ায় শেষপর্যন্ত তা সামরিক উত্তেজনায় গড়াতে দেখা গেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও কী তেমনটা ঘটতে পারে?

"সেটা আপনারা (সামনে) দেখতে পাবেন," আলোচনা ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে আবার ইরানের হামলা চালাবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে এএফপি'কে বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।