Image description

ইরান আক্রমণের আগে থেকেই, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এবং জনপরিসরে তীব্র, উত্তেজক ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৬ এপ্রিল হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সংবাদমাধ্যমে সিএনএন তার এই দীর্ঘ বক্তব্যের মধ্যে ইরান আক্রমণ এবং বৈদেশিক নীতিমালা সংক্রান্ত বেশ কিছু দাবি যাচাইয়ের মাধ্যমে ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেইসঙ্গে, ট্রাম্পের বিভিন্ন সময়ে আলোচিত ও উল্লেখযোগ্য ‘মিথ্যা’ দাবিগুলোও সামনে এনেছে এই সংবাদমাধ্যম।

 

সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কিছু ভুয়া দাবির পাশাপাশি আরও কিছু বক্তব্য ট্রাম্প রেখেছেন, যেগুলো খতিয়ে দেখার সেভাবে সুযোগ নেই। যেমন—সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এখন নাকি তাদের বন্ধুদের কাছে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগেই ইরানে হামলা করা উচিত ছিল। সিএনএন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, অতীতেও এমন অনেক ভুয়া বক্তব্য এবং দাবি করেছেন ট্রাম্প।

 

লাদেনকে ‘সরানোর’ কথা বইয়ে লেখা আছে
যে জিনিস তিনি লেখেননি, তা নিয়েও তিনি দাবি করেছেন এবং বারবার করেছেন। প্রসঙ্গটি ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে। ২০২০ সালে তার নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছিল। এরপর তিনি বলেন, “আমি আরেকটি কাজও করেছিলাম, কিন্তু সেটি কেউ তুলে ধরেনি—ওসামা বিন লাদেন। যদি আপনারা আমার বই পড়েন, আমি বলেছিলাম, ‘ওকে সরিয়ে ফেলতে হবে’—ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের এক বছর আগে। তাই আশা করি আপনারা বইটি পড়বেন।”

 

বাস্তবে, ট্রাম্পের লেখা বইটিতে কেবল একবার লাদেনের নাম উল্লেখ করা ছাড়া তাকে কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত বা তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া দরকার কি না—এমন কিছুই বলা হয়নি। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশে মার্কিন বাহিনী ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে, যা ট্রাম্প প্রথম ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছরেরও আগের ঘটনা।

 
 

 

‘কোনো যুদ্ধবিমান ঘায়েল করতে পারেনি ইরান’
ট্রাম্পের মিত্রপক্ষ কুয়েতের ‘ভুলবশত’ আঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমান ভূপাতিত হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যে বিমানগুলো হারিয়েছে, সেগুলো মূলত ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু এই সংবাদ সম্মেলনের মূল আলোচনাই ছিল দুই মার্কিন বিমানচালককে উদ্ধারের ঘটনা, যাদের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান গত সপ্তাহে ইরান গুলি করে ভূপাতিত করেছিল। আর সেটি ট্রাম্প স্বীকারও করেছেন। এ ছাড়া জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন নিশ্চিত করেন যে, উদ্ধার অভিযানের সময় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট বিমানও খোয়াতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। আরও জানা যায়, সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে হামলায় ইরান একটি মার্কিন E-3 সেন্ট্রি (AWACS) বিমান ধ্বংস করে।

 

‘আটটা যুদ্ধ শেষ করেছি’
বিভিন্ন ‘ভুয়া’ দাবির মধ্যে একটি নিয়মিতই আওড়ান ট্রাম্প, “আমি আটটি যুদ্ধ শেষ করেছি।” বাস্তবে, তার তালিকায় এমন দুটি পরিস্থিতি রয়েছে যা কখনোই যুদ্ধ ছিল না (মিসর-ইথিওপিয়ার কূটনৈতিক বিরোধ এবং সার্বিয়া-কসোভো প্রসঙ্গ), আর সঙ্গে রয়েছে অন্তত একটি যুদ্ধ যেটি এখনও শেষ হয়নি (রুয়ান্ডা ও কঙ্গোকে ঘিরে সংঘাত)।

 

‘ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ কয়েদি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে’
ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো নিজের শাসনামলে ‘লাখ লাখ বন্দিকে’ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প বা তার সহযোগীরা কখনোই এই দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরাও এহেন দাবির কোনো ভিত্তি খুঁজে পাননি বলে সিএনএন ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

 

‘দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৫০০০ মার্কিন সেনা আছে’
দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন সৈনিকের সংখ্যা নিয়ে একাধিকবার বাড়িয়ে বলেছেন ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ হাজার সেনা রয়েছে, বলেছেন তিনি। তবে প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে মার্কিন সেনা ছিল ২৬,৭২২ জন, যার মধ্যে ২৩,৪৯৫ জন সক্রিয় দায়িত্বে ছিলেন। বাড়তি ২০ হাজারের কথা তিনি বললেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের তথ্য নেই।

 

‘কামালা হ্যারিস তো কখনোই বর্ডারে যায়নি’
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসকে ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন ‘বর্ডারের জার’ হিসেবে। সঙ্গে আবার বিদ্রুপ করে এও বলেছেন, হ্যারিস ছিলেন এমন এক বর্ডারের জার যিনি কখনও বর্ডারেই যাননি। বাস্তবে, ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন হ্যারিস সীমান্ত সফর করেছেন একাধিকবার। বাস্তবে হ্যারিস দুইবার সীমান্ত সফর করেছেন—একবার ২০২১ সালে এবং আরেকবার ২০২৪ সালে। জো বাইডেনের প্রশাসনও একাধিকবার উল্লেখ করেছে, মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অভিবাসনের মূল কারণ মোকাবিলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হ্যারিসকে, কোনো প্রতাপশালী নিয়ন্ত্রক বানানোর জন্য নয়।

 

সূত্র: Fact check: Trump makes false claims about the Iran war and his foreign policy record