ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রমাণ করে পারমাণবিক অস্ত্র নিজের কাছে রাখার উত্তর কোরিয়ার সিদ্ধান্ত একেবারে সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলিতে দেওয়া এক ভাষণে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ ও আগ্রাসনের’ অভিযোগও করেন তিনি। তবে ভাষণে সরাসরি ইরানের নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
কিম জং উন বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ‘মিষ্টি কথা’ প্রত্যাখ্যান করে উত্তর কোরিয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’’ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা এখন ‘অপরিবর্তনীয়’ বলেও জানিয়ে দেন তিনি।
এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘আসন্ন’ হুমকি বলে অভিহিত করেন। অথচ এর মাত্র কয়েক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতেই দেশটিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশগুলো মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে অরক্ষিত বলে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা পোষণ করে আসছে, ইরানের সঙ্গে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত সেটিকে আরও দৃঢ় করেছে। অন্যদিকে যাদের এই অস্ত্র আছে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করতে পারে।
কিম জং উনের এই ভাষণের সময় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি কিমের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প; যা ২০১৯ সালে ভেস্তে যাওয়া কূটনৈতিক পথকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার নেতার সাম্প্রতিক এসব মন্তব্যে ভবিষ্যতে যেকোনও বৈঠক যে বিগত সম্মেলনগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অতীতের সব বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণ। ট্রাম্পের সঙ্গে কিম জং উন ফের বৈঠকে বসার ইঙ্গিত দিলেও উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে মেনে নেওয়ার এবং দেশটির বিরুদ্ধে ‘শত্রুভাবাপন্ন নীতি’ ত্যাগ করতে হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত দিয়েছে পিয়ংইয়ং।
উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে কয়েক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়। ইরান কিংবা ভেনেজুয়েলার বিপরীতে দেশটি দাবি করেছে, তাদের কাছে ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র এবং এমন উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের যেকোনও স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও এসব অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা কখনও করা হয়নি।
সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া বেশ কিছু উন্নতমানের ও দূরপাল্লার অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্রুজ মিসাইল উৎক্ষেপণ এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন রকেটের মহড়া। গত মাসে ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আরও সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিম জং উন। অস্ত্রের সংখ্যা এবং তা ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাকে তিনি দলের ‘দৃঢ় ইচ্ছা’ বলে অভিহিত করেন।
কিশোরী কন্যা কিম জু আয়েকে এসব প্রদর্শনীতে সামনে নিয়ে আসছেন কিম জং উন। এর মাধ্যমে তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল স্থায়ী নয়, বরং এটি বংশপরম্পরায় চলবে বলে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে পিয়ংইয়ং। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইউক্রেন সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের প্রশিক্ষণের ফুটেজ প্রচার করেছে। দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্ককে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী অংশীদারিত্ব হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই সম্পর্ক দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা পিয়ংইয়ংয়ের প্রচারণার কেন্দ্রে চলে এসেছে। কিম রাশিয়াকে আর্টিলারি শেল ও রকেট সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছেন এবং রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর বিনিময়ে পিয়ংইয়ং খাদ্য, জ্বালানি এবং সম্ভবত সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যও পাচ্ছে যা উত্তর কোরিয়াকে তাদের অস্ত্র আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার এই জোট ওয়াশিংটনের জন্য জটিলতার এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়া একাকী নয়, বরং মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার দেশগুলোর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান বজায় রাখলেও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেননি কিম জং উন। সম্প্রতি ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার জন্য সামান্য পথ খোলা রেখেছেন তিনি।
তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হলেও পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করা সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার শর্ত দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: সিএনএন।