Image description

এনডিটিভির মন্তব্য প্রতিবেদন

২৩ মার্চ যখন আমেরিকায় বাজার খোলার প্রস্তুতি চলছিল এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলতে দেয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একটি চমকপ্রদ ঘোষণা দেন। তিনি ইরানের জ্বালানি ও পারমাণবিক অবকাঠামোর ওপর আক্রমণকে আগামী পাঁচ দিনের জন্য আপাতত স্থগিত করেন।
বাজার এই ঘোষণায় ইতিবাচক সাড়া দিলেও, ইরান ট্রাম্পের এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়নি। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা হয়নি। ইসরাইলও এই ‘বিরতি’ ঘোষণায় অংশ নেয়নি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, ইসরাইল তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই করবে।

এই হঠাৎ ঘোষণার পর একটি সম্ভাব্য সমাধানের রাস্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যখন বিশ্ব সতর্ক আশাবাদ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে তখনও ইরান ও ইসরাইল রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে গেছে।
ইরানের যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ‘বিরতি’ সত্ত্বেও কোনো যুদ্ধবিরতি বা সমাধানের লক্ষণ নেই। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছে, ইরান ধ্বংস হয়েছে, তাদের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে এই অভিযান শেষ করার কথা ভাবছে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।

তিনটি প্রাথমিক লক্ষ্য

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আগাম হামলা শুরু করে। এর মূল তিনটি লক্ষ্য ছিল- ইরানের নেতৃত্ব, সামরিক শক্তি, অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা, যাতে তারা যুদ্ধ চালাতে না পারে এবং হয় সরকার ভেঙে পড়বে, নয়তো জনগণ বিদ্রোহ করবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে চিরতরে বিরত রাখা।
শুরুতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর ৪০ জনেরও বেশি উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর, তারা ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার, ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ও লঞ্চার ধ্বংস করতে থাকে। এরপর গ্যাস ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। ধারণা ছিল, যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান এখনও শক্তভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি

সবচেয়ে বড় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। এটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। যদিও ওই প্রণালিতে বাস্তবে মাইন পাতা হয়নি, তবে ইরানের ঘোষণার পর এবং কিছু তেল ট্যাংকারে হামলার কারণে শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ভারত ও চীন কিছু ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতি পেলেও, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এটি বড় সংকট।

পারমাণবিক হুমকি

যুদ্ধের প্রথম দিকেই পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়। কিন্তু ইরান পাল্টা জবাব দেয় এবং ইসরাইলের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র দিমোনাতে হামলা চালায়। এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদি ভবিষ্যতে এই সংঘর্ষ পারমাণবিক স্থাপনাকে আঘাত করে, তাহলে বড় ধরনের বিকিরণ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এমনকি ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সম্ভাব্য সমাপ্তি

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সূত্র বলছে, ট্রাম্প দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করতে চাইছেন। তবে এবার পরিস্থিতি আগের মতো সহজ নয়। গুজব আছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল করে তেল-গ্যাস নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। এছাড়া ৩,০০০-৫,০০০ মেরিন পাঠিয়ে ৬০ ভাগ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম দখলের কথাও শোনা যাচ্ছে।

যুদ্ধের বাস্তবতা

ইসরাইলের লক্ষ্য হলো ইরানে সরকার পরিবর্তন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে। ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে। ইরানের জন্যও এটি এখন শুধু যুদ্ধ নয়, বরং সম্মান রক্ষার লড়াই। তারা চায় তাদের পারমাণবিক অধিকার স্বীকৃতি পাক, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হোক এবং ভবিষ্যতে আর হামলার যাতে না হয় তার নিশ্চয়তা দেয়া হোক।

উপসংহার

এই যুদ্ধ প্রতিদিনই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং পানিপথে সরবরাহে হামলার হুমকি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় বিপদ তৈরি করছে। সবচেয়ে বড় আশা হলো, ডনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবে একটি বিজয়ের পথ খুঁজে নিয়ে এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে ইসরাইল একা এই যুদ্ধ চালাতে পারবে না। ইরানও প্রস্তুত রয়েছে যেকোনো নতুন হুমকির জবাব দিতে, যেখানে শুধু টিকে থাকাই হবে তাদের জন্য একটি বড় বিজয়।

(লেখক ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি চিন্তান রিসার্স ফাউন্ডেশনের একজন সিনিয়র রিসার্স কনসালট্যান্ট)