Image description

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চলমান যুদ্ধে ইরানকে ঘায়েল করার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কয়েক দশক ধরে ফন্দি আঁটছিল। এতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের রাজধানীতে হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ এই দুই গোয়েন্দা সংস্থা। অভিযানে হত্যার শিকার হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এর পর অভিযান পরিচালনার কিছু তথ্য প্রকাশ করে ইসরায়েল। এতে আরও স্পষ্ট হয় ইরানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকলাপ।

 

এতদিন ইসরায়েলি গোয়েন্দার খবর শোনা গেলেও এবার প্রকাশ্যে আসল ইরানের গোয়েন্দা শক্তির কথা। রীতিমতো ইসরায়েলের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইরানের গোয়েন্দা এজেন্টরা। দীর্ঘদিন গুপ্ত হামলা, বিক্ষোভ উসকানোসহ তথ্য পাচারের শিকার হওয়া ইরানের টনক নড়েছে ২০২২ সালে। সেই থেকে ইসরায়েলের ভেতরে গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে তেহরান। এসব তথ্য জানিয়েছে অলাভজনক অনুসন্ধানী সংবাদ আউটলেট ড্রপ সাইট নিউজ।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জানুয়ারিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে অর্থনীতি তলানিতে ঠেকলে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরান সরকার তখন এতে বিদেশি ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল। দাবি করা হয়, এটি ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহ। সিআইএ’র সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেও এই দাবি পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তিনি জানান, মোসাদের এজেন্টরা মাঠে থেকে এই বিদ্রোহ সংগঠিত করতে সাহায্য করেছে।

 

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ভেতরে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে আসছে। দেশটির সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে গোপন অভিযান, হত্যা, বলপ্রয়োগ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। এতে করে ইরানি সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা চলচে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করা এবং সরকারবিরোধী ফার্সি ভাষার মিডিয়া নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা।

 

 

ড্রপ সাইট নিউজ ইসরায়েলি নাগরিকদের লক্ষ্য করে ইরানের পরিচালিত গোপন প্রভাব বিস্তার অভিযানের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ছবি ও অন্যান্য নথি হাতে পেয়েছে। এসব নথি থেকে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা ইসরায়েলের ভেতরে সামাজিক বিভাজন তৈরি ও ইসরায়েলি নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে।

 

ড্রপ সাইট দুজন ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের একজন সরাসরি এই কর্মসূচিতে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ‘একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে একটি ছায়াযুদ্ধ চলছে। তবে এই ধরনের অভিযানে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করে না।’

 

গত দুই বছরে ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে প্রায় তিন ডজন ইসরায়েলি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বেশিরভাগই নজরদারি ও ভাঙচুরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতার চেষ্টার অভিযোগও ছিল।

 

ইসরায়েলি থিংক ট্যাংক ডোর মোরিয়া অ্যানালিটিক্যাল সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে ইসরায়েলিদের গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মামলা ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।

 

চলমান যুদ্ধের মাঝে ইসরায়েলি সরকার তথ্য নিয়ন্ত্রণেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব সংবাদ সামরিক সেন্সরের মাধ্যমে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফুটেজ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। যদিও ২০২৫ সালের সংঘাতের শুরুতে এই ফুটেজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং দেশে-বিদেশে যুদ্ধ সম্পর্কে জনমতকে প্রভাবিত করেছিল।

 

ছবি: সংগৃহীত

ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা তথ্য থেকে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ভেতরে ইরানের গোপন অভিযানের বিশ্বস্ত তথ্য পাওয়া গেছে। নথিগুলো দেখাচ্ছে, ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় (এমওআইএস) ইসরায়েলে বসবাসকারী ব্যক্তিদের নিয়োগ দিচ্ছে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতীক সংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড। এগুলো ২০২৩ সালে ইসরায়েলের বিচার বিভাগীয় সংস্কার বিক্ষোভ থেকে শুরু করে গাজার গণহত্যা পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় নিয়ে।

 

চলমান যুদ্ধে দুই পক্ষ এই গোপন নেটওয়ার্কগুলো কতটা ব্যবহার করছে, তা পুরোপুরি জানা না গেলেও কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত ১২ মার্চ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েল তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘সাধারণ ইরানিদের’ কাছ থেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য পাচ্ছে। অন্যদিকে ড্রপ সাইটকে এক ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের ভেতরে যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হচ্ছে, সেই নিশানা সম্প্রতি ঠিক করা হয়েছে। আর এগুলো ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় স্থানীয় সোর্স থেকে সংগ্রহ করছে। তবে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

 

ড্রপ সাইটের সঙ্গে কথা বলা এক ইরানি এক্টিভিটস এই তৎপরতাকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। লক্ষ্য হলো সাধারণ ইসরায়েলিদের নিয়োগ করে ইসরায়েলের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করা। তবে ইসরায়েল ইরানের ভেতরে যে মাত্রায় অভিযান চালায়, হত্যাকাণ্ড ঘটায় এবং অস্থিরতা উসকে দেয়; সে তুলনায় ইরানের এই তৎপরতা অনেক কম।

 

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া পরিচয়ে বহু ইরানি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাদের অর্থ, পুরস্কার এবং এমনকি ছোট আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে।

 

ড্রপ সাইটকে দেখানো নথিপত্রে রয়েছে ইরানি গোয়েন্দাদের তৈরি সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ, ইসরায়েলি সোর্স তৈরির গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং নিয়োগ করা ইসরায়েলিদের বিতরণ করা পোস্টার, লিফলেট ও টি-শার্টের ছবি। নথিগুলো ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

ইরানের এই পাল্টা অভিযানের শুরু ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর থেকে। হিজাব না পরার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ২২ বছর বয়সী এই তরুণীকে পুলিশি হেফাজতে মারধর করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন। যদিও ইরান সরকার বলেছে, তিনি আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হয়, পুলিশ ও বাসিজ মিলিশিয়ার কয়েক ডজন সদস্যও মারা যায়। ইরানি গোয়েন্দারা নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্তে আসেন, এই সহিংসতার পেছনে ইসরায়েলি অপারেটিভদের হাত ছিল। এরপরই তারা ইসরায়েলের কৌশল অনুসরণ করে নিজেরাও ইসরায়েলি নাগরিকদের নিয়োগের অভিযান শুরু করেন।