বিংশ শতকজুড়ে ইরান ছিল ‘আধুনিকতা’ ও ‘প্রতিআধুনিকতা’র নানামুখী টানাপড়েনে জর্জরিত। আর এই রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত দেশটিকে ঠেলে দেয় ইসলামপন্থীদের বিজয়ের দিকে।
গত শতকের একদম গোড়ার দিকে ইরান রাজনৈতিক আধুনিকতার পথে হাঁটতে শুরু করে। প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে তারা ১৯০৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান অনুমোদন করে।
বিংশ শতক জুড়ে ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের নানামুখী বাঁকবদল নিয়ে একটি বই লিখেছেন ফ্রান্সের দুই গবেষক স্তেফানি রোজা এবং আমিরপাশা তাভাক্কোলি। গত ১৪ মার্চ প্রকাশিত বইটির নাম ‘এ তঁ অঁতি‑ল্যুমিয়ের অঁ ইরাঁ’ বা ‘ইরানে আলোকায়ন ও প্রতিআলোকায়ন’।
দার্শনিক স্তেফানি রোজা এবং রাজনীতি বিজ্ঞানী আমিরপাশা তাভাক্কোলি মনে করেন, ইরানের বৈপরীত্যময় গতিপথটি আসলে সংস্কারপন্থী আন্দোলন ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মধ্যে শতাব্দীজুড়ে চলা রাজনৈতিক সংগ্রামের ফলাফল। এর মধ্যে দিয়ে দেশটি ‘সমকালীন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক পরীক্ষাগার’-এ পরিণত হয়েছে।
ইরান নিয়ে লেখা বই প্রকাশ উপলক্ষে দুই লেখকের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মঁদ।
প্রশ্ন : ইরানে ২০ শতকের শুরুতেও কাজার রাজবংশের শাসন চলছিল। তারা নিজেদের শাসনক্ষমতাকে আল্লাহপ্রদত্ত বলে দাবি করতেন। এর মধ্যেও কোন প্রেক্ষাপটে ১৯০৫-১৯১১ সালের সাংবিধানিক বিপ্লব ঘটেছিল?
আমিরপাশা তাভাক্কোলি : ইরানের রাজারা ১৯ শতকে ইউরোপ সফরের সময়ে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেন।
স্তেফানি রোজা : সাংবিধানিক বিপ্লবের আগে ইরানি সমাজে কয়েকটি বিভাজন ছিল। বিশেষ করে রাজশক্তি এবং শিয়া ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক প্রাধান্য অর্জন করতে চাইছিলেন তারা বিভেদে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়া কাজার রাজবংশ দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের বড় অংশ শোষণ করার অধিকার বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে তুলে দিয়েছিল। এতে প্রায়ই খাদ্য সংকটে ভোগা জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। আধুনিক শিল্প বলতে তেমন কিছু ছিল না। এমন প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় অসন্তোষ, জনঅসন্তুষ্টি এবং উদারপন্থী অভিজাতদের আকাঙ্ক্ষার সমন্বয় থেকেই ১৯০৬ সালের সেই উত্থান ঘটে। শেষ পর্যন্ত কাজাররা আংশিকভাবে দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়।
১৯০৬ সালের সংবিধান কোন ধরনের অগ্রগতি বয়ে এনেছিল?
তাভাক্কোলি : নিশ্চিতভাবেই ওই ঘটনার আগে ও পরে বড় পার্থক্য ছিল। সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য একটি দেওয়ানি আইন প্রবর্তনের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে মানুষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বদলে সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার সুযোগ পায়। এছাড়া বিপ্লবের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্ভব ঘটে, বিশেষ করে ইরানি বামপন্থীদের।
এই সংস্কার সম্পর্কে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান কী ছিল?
রোজা : ধর্মীয় নেতাদের একাংশ শুরুতে বিষয়টিকে সমর্থন করলেও শিগগিরই এর বিরুদ্ধে চলে যায়। নেতারা মনে করছিলেন অতিরিক্ত পরিবর্তন ঘটে গেছে। তারা শরিয়াহ আইন কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি নারীদের ভোটাধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং শিয়া ইসলামের মর্যাদার মতো বিষয়গুলোতে তারা উদারপন্থীদের সরাসরি বিরোধিতা করেন। তাদের মতে শিয়া ইসলামই রাষ্ট্রের সরকারি ধর্ম হিসেবে থাকতে হবে। তবে সব ধর্মীয় নেতার মনোভাব একই রকম ছিল না। অধিকাংশই নীরব ভূমিকা নেন। তারা রাজনীতিতে জড়াতে অস্বীকার করতেন এবং ধর্মকেই নিজেদের একমাত্র ক্ষেত্র বলে মনে করছিলেন। তবে কিছু ধর্মীয় নেতা সরাসরি সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন।
ইরান খুব কম মুসলিম দেশের একটি- যেখানে কখনও পশ্চিমা শক্তির উপনিবেশ তৈরি হতে পারেনি। এরপরেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো দেশটিকে প্রচণ্ড অস্থিতিশীল করেছে। এর প্রভাব কী পড়েছিল?
রোজা : ১৯ শতকের শুরুতেই যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া ইরানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের (গ্যাস, কাঠ এবং পরে তেল) দিকে নজর দেয়। এগুলোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন চুক্তি করে। তারা দেশটিতে রেলপথ, শিল্পায়নের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পও শুরু করে। ফলে ইরান বিদেশি পুঁজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এতে ইরানের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ হাজির হয়: কীভাবে আধুনিকায়ন ঘটানো যাবে, আবার স্বাধীনতাও রক্ষা করা যাবে!
তাভাক্কোলি : পল ভালেরির ভাষায় ২০ শতকে ইরানি সমাজে এক ধরনের ‘মানসিক সংকট’ তৈরি হয়। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয় প্রশ্নে সংকট দেখা দেয়। অনেকের কাছে শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বই ছিল ইরানি জাতি ও সংস্কৃতির প্রতীক। একই সময়ে প্রযুক্তিগতভাবে ইরান পিছিয়ে পড়ছিল এবং কাজার যুগের শেষে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে দেশটি বিপুল ভূখণ্ড হারায়। তখন জনমানসে প্রধান অনুভূতি ছিল, তাদের দেশ অনেক সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
পাহলভি রাজবংশ ১৯২৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর কি এই আত্মদহন কেটেছিল?
রোজা : কাজার রাজবংশের পতনের পর রেজা শাহ পাহলভি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কর্মসূচি চালান। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন স্বৈরাচারী শাসক। তিনি মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তিনিও আতাতুর্কের মতো একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী আধুনিকায়নের চিন্তা ধারণ করতেন। তবে সে সময় প্রগতিশীল অনেক পরিবর্তনও ঘটেছিল। তার সময়ে দেওয়ানি আইন বহাল থাকে এবং তিনি ধর্মীয় নেতাদের কেবল ধর্মীয় বিষয়েই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। ইসলামি পর্দা নিষিদ্ধের চেষ্টার পাশাপাশি পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাককে উৎসাহিত করেন।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে একটি ঘটনা ইরানের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। সে সময়ে ব্রিটেন ও অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকা তেল নিয়ে বিতর্ক বাড়ছিল। তখনকার ইরানি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেঘ তেল খাত জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন। এটি জনগণের মধ্যে বিপুল আশা জাগায়। তবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ-এর যোগসাজসে এক অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ফলে শাহকে শুধু একজন স্বৈরাচারী শাসক নয়, বিদেশি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবেও জনগণ দেখতে শুরু করে।
এরপরেও তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ১০ বছর পর যখন ‘হোয়াইট রেভ্যুলিউশন’ নামে বড় সংস্কার কর্মসূচি চালু করেন তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?
রোজা : এটি সত্যি তখন ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্তে ছিল ইরানে। ১৯৬৩ সালে ‘হোয়াইট রেভ্যুলিউশন’ নারীদের ভোটাধিকার এনে দেয়। পাশাপাশি শুরু হয় কৃষি সংস্কার। গ্রামীণ অঞ্চলসহ সারা দেশে জনগণের সাক্ষরতা বাড়ানোর কর্মসূচি চালু হয়। তবে এসব সংস্কার ধর্মীয় নেতাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যে শাহের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ সময়কালেই রাজনীতির মঞ্চে রুহুল্লাহ খোমিনির (১৯০২-১৯৮৯) আবির্ভাব ঘটে।
ইরানে ঠিক কখন রাজনৈতিক ইসলামের বিকাশ ঘটতে শুরু করে?
রোজা : হাসান আল-বান্নার উদ্যোগে মিসরে আধুনিক রাজনৈতিক ইসলামের জন্ম। তিনি নিজ দেশে রাজনৈতিক আধুনিকায়নের ‘প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে ১৯২৮ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল সংবিধানে আইনের চোখে সব নাগরিকের সমতা ঘোষণা এবং ১৯২৪ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক খিলাফতের অবসান ঘটানোর প্রতিক্রিয়া।
আল-বান্না সবচেয়ে শক্ত অর্থে একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল প্রকল্প’ গড়ে তুলেছিলেন। সেটি হলো: অতীতে ফিরে যাওয়া নয়, বরং আধুনিকতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিআধুনিকতাকে ইউরোপে একই সময়কার প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক প্রকল্পগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বস্তুত সেসব থেকেও আল-বান্না কিছু অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। হাসান আল-বান্না ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে আংশিকভাবে তার সংগঠনের কাঠামো গড়ে তোলেন। যেমন: নেতার বন্দনা, যুব সংগঠন তৈরি এবং জনজীবনের সব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ।
ইউরোপীয় প্রতিআধুনিকতা অনুসরণে মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তাধারাতে প্রচণ্ড ইহুদিবিদ্বেষও দেখা যায়। অবশ্য এটাও বলা যেতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই এক ধরনের ঐতিহ্যগত ইহুদিবিরোধিতা ছিল। সেখানে ইহুদিরা দীর্ঘদিন ধরে অধস্তন সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করছিল। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের নতুন ইহুদিবিরোধী ধারণার বেশিরভাগই পশ্চিম থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো প্রথমে আসে কিছু আরব খ্রিষ্টানের মাধ্যমে, যারা ‘দ্য প্রোটোকলস অফ দ্য এল্ডারস অফ জায়ন’-এর মতো গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন। বইটি দ্রুত বিপুল পরিচিতি পায়, এমনকি পরবর্তী সময়ে ‘মাইন কম্ফ’-এর জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ইরানে রাজনৈতিক ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ১৯৪৫ সালে ‘ফেদায়িন অফ ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ইরানে গঠিত প্রথম ইসলামি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন। এর নেতা সাইয়্যেদ মোজতবা নাভাব সাফাভি ১৯৫৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রধান মতাদর্শী সাইয়্যিদ কুত্ব-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এরপর থেকেই ফেদায়িন অফ ইসলাম’-এর ওপর মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়। সাফাভি ছিলেন রুহুল্লাহ খোমেনির অন্যতম পরামর্শদাতা, যিনি পরে কুত্ব-এর কিছু লেখা ফারসিতে অনুবাদ করেন। এভাবে একই মতাদর্শের ব্যক্তিরা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একে অন্যকে প্রভাবিত করতেন।
আপনারা লিখেছেন, ইসলামপন্থা ইউরোপীয় রক্ষণশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিষয়টি অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। এটি কি আরেকটু ব্যাখ্যা করতে পারেন?
রোজা : কয়েকটি দিক থেকে এই তুলনা করা সম্ভব। প্রথমত এ ধরনের সব আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র রয়েছে। অর্থাৎ এগুলো মূলত একই শত্রুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইউরোপীয় রক্ষণশীল ঐতিহ্যের জন্ম হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এডমন্ড বার্ক, জোসেফ দ্য মেইসত্র এবং আবে বারেয়েলের মতো চিন্তকদের প্রত্যেকে নিজের মতো করে বুঝেছিলেন- অতীতের মূল্যবোধ রক্ষার জন্য নতুন যুক্তি ও নতুন পদ্ধতি দরকার। একইভাবে মুসলিম বিশ্বে তরুণ তুর্কিদের বিপ্লব এবং প্রথম সংবিধান প্রবর্তনের ঘটনা ইসলামপন্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
দ্বিতীয় সাদৃশ্য হলো- এসব চিন্তক তাদের জনগণের তথাকথিত মৌলিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। এগুলোকে তারা এক ধরনের ‘জাতিগত-ধর্মীয়’ বা স্পর্শাতীত ঐতিহ্য হিসেবে মনে করতেন। তাই লিঙ্গসমতা, গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে তারা ‘প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়া আমদানি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাছাড়া জোসেফ দ্য মেইসত্র-এর মতো পূর্ণসংস্কারবাদী ক্যাথলিক চিন্তকের ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণাগুলোর সঙ্গে কুত্বের ধারণাও অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। মেইসত্রও কিছু পরিবর্তন সাপেক্ষে খ্রিষ্টীয় মহিমার প্রচার করা, নরনির্ভর অবক্ষয় রোধ এবং মুক্তির প্রত্যাশার দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন।
সবশেষ দিক হলো, এসব প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন একে অপরকে পরিপুষ্ট করে। যেমন সাইয়্যিদ কুত্ব গভীরভাবে অ্যালেক্সিস ক্যারলের (১৮৭৩-১৯৪৪) দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ক্যারল ছিলেন একজন প্রতিক্রিয়াশীল ও ইউজেনিক্সপন্থী লেখক। তিনি পশ্চিমা সভ্যতার পতনের ধারণা তুলে ধরেন। আর অবশ্যই ছিল ইহুদিবিদ্বেষ, যেখানে আধুনিকতার নানা সমস্যার জন্য ইহুদিদের দায়ী করা হয়। এসব কিছুই প্রতিক্রিয়াশীল ধারার মধ্যে একটি সাধারণ যোগাযোগ সূত্র।
এসব সাদৃশ্য থেকে আপনারা বলছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। একইসঙ্গে আপনারা আরেকটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তা হলো পূর্বের একটি দেশ হিসেবে ইরান স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপীয় আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু একই সময়ে অন্য মুসলিম দেশগুলোতে ‘নাহদা’র মতো সংস্কার প্রচেষ্টা (নাহদা হলো আরব পুনর্জাগরণ বা আরব পুনর্দীক্ষা আন্দোলন। এটি ১৯ শতকের শেষার্ধ ও ২০ শতকের শুরুতে মূলত মিসরে শুরু হয়ে পরে আরব বিশ্বের অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে) নেয়া হয়েছিল। সেসব দেশেও তো ধর্মীয় শক্তি আরো শক্তিশালী হয়েছিল। তাহলে কি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে, যার কারণে সংস্কার বা আধুনিকতার মধ্যেও ধর্ম শক্তিশালী থাকে?
রোজা : আমরা স্পষ্ট পার্থক্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করি না, কিন্তু সেগুলোকে অতিরঞ্জিত না করার আহ্বান জানাই। ইরানে আধুনিকতার পক্ষের শক্তিগুলোর পরাজয় মোটেই অনিবার্য ছিল না। সেখানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ছিল কয়েক দশক ধরে চলা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। তবে এটিও মনে রাখতে হবে মুসলিম বিশ্বে আলোকায়নের ধারণাটি ছিল আমদানিনির্ভর। সময়ের বিচারে তা উপনিবেশবাদ ও পূর্বের ওপর পশ্চিমের শোষণের ইতিহাস থেকে আলাদা করা যায় না। ফলে এই ধারণাগুলো গ্রহণের প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে ওঠে, এবং অনেকেই এগুলোকে আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
আপনারা লিখেছেন বিংশ শতকের সূচনালগ্নে ইরানি বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা শিয়াবাদের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। ধর্মকে কীভাবে ব্যাখ্যা করার কারণে তারা ওই অবস্থানটিতে পৌঁছালেন?
রোজা : এই বুদ্ধিজীবীরা আসলে মোহাম্মদ মোসাদ্দেঘের ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় এমন অবস্থান গ্রহণ করেন। তার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনাকে এমন কিছু দেশের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়েছিল, যেসব দেশ নিজেদেরকে জনগণের অধিকারের রক্ষক বলে দাবি করত। এর মধ্যে দিয়ে বামপন্থীরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তা হলো পশ্চিমা আধুনিকতার মতো করে ইরানি আধুনিকতা সম্ভব নয়। তারা আরেকটি পথ খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন। তাদের ভাষায় এটি ছিল ‘নিজের কাছে ফিরে যাওয়া’। অর্থাৎ মূলত ধর্মীয় পরিচয়ের কাছে ফিরে যাওয়া। তারা এমন ধারণাকে সমর্থন করতে শুরু করেন যেখানে বলা হচ্ছিল, শিয়া ধর্মের মধ্যে বিশেষ এক স্বকীয়তা ও স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, যেগুলো আধুনিক ব্যবস্থার মধ্যে পাওয়া যায় না। আধুনিক ধারণাগুলো পশ্চিমা হওয়ায় বামপন্থীদের কাছে সেগুলোকে প্রচণ্ড পরনির্ভরশীল বলে মনে হতে শুরু করে।
এ ধরনের চিন্তাবিদদের মধ্যে অনেক দ্বন্দ্বও ছিল। যেমন ‘অকসিডেন্টোসিস’ বইয়ের লেখক জালাল আল-ই আহমাদ (১৯২৩–১৯৬৯) তার বইয়ের শিরোনামের শব্দটিকে পশ্চিমের যন্ত্রনির্ভরতার সমালোচনা অর্থে ব্যবহার করেন। তিনি প্রযুক্তিগত আধুনিকতার প্রয়োজনীয়তা, এমনকি সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রয়োজন স্বীকার করেছিলেন। তবে একইসঙ্গে তিনি ইরানকে নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়, ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ প্রথার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক আলি শরিয়াতি (১৯৩৩-১৯৭৭) বিশেষ এক ধারণার বিকাশ ঘটান। সেটি হলো ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রীদের যেসব অবদান তাকে প্রভাবিত করেছিল, তার সব আগে থেকেই ইসলামে বিদ্যমান। আলি শরিয়াতি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় অনেকের আদর্শিক অনুপ্রেরণা ছিলেন। তার মতে, কার্ল মার্কস বা ফ্রিদরিখ এঙ্গেলসের চিন্তা থেকে কিছু ধার করার প্রয়োজন নেই, কারণ মুক্তির প্রগতিশীল আদর্শগুলোর সবই পাওয়া যায় ইমাম আলি (রা.)-এর মধ্যে। আলি শরিয়াতিকে তাই ‘লাল শিয়াবাদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা হতো। ইরানি বামপন্থীরা এভাবে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাভাক্কোলি : অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী বিশ্বাস করতেন, ইসলামপন্থী এবং তাদের একজন সাধারণ শত্রু আছেন। তিনি হলেন বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক ‘শাহ’। ফলে দুই পক্ষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতা দূরীভূত হয়ে এক ধরনের মিলন ঘটে। তবে বামপন্থীদের জন্য এটি ছিল এক বিরাট ভুল।
মিশেল ফুকোর মতো পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের কাছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রতি আকর্ষণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
রোজা : মিশেল ফুকো ১৯৭৮ সালে ইরান সফর করার সময় সেখানে বিপ্লব পরিস্থিতি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। খোলাখুলি বললে, খোমেনিপন্থী জনতার উগ্র উন্মাদনাতেও তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, বিষয়টি বাস্তবে তার নিজের প্রতিআধুনিক রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। এই দার্শনিক নিজে সমকামী ছিলেন এবং যৌন সংখ্যালঘু, প্রান্তিক মানুষ ও রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতেন। অথচ শেষ পর্যন্ত তিনি এমন এক ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করেন যেখানে সেসব অধিকারই পদদলিত হয়।
ফ্রান্সের প্যারিসে নির্বাসনে থাকার সময় রুহুল্লাহ খোমেনি নফ্ল-ল্য-শাতো থেকে অনেক বুদ্ধিজীবীর মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। বিশেষ করে বামপন্থী সাংবাদিকেরা তাকে মহাত্মা গান্ধীর মতো দেখতে শুরু করেন। অবশ্য সে সময় আয়াতুল্লাহ তাদের কাছে নিজের সব উদ্দেশ্য প্রকাশ করেননি। তিনি দাবি করেছিলেন নারীরা তাদের ইচ্ছামতো পোশাক পরার বিষয়ে স্বাধীন। তবে ‘হোয়াইট রেভ্যুলিউশন’-এর সময়ে তার অবস্থান এবং নিজস্ব লেখালেখিতে ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে মতামত অবশ্যই তখনও যাচাই করা সম্ভব ছিল।
খোমেনি প্রতিষ্ঠিত যে শাসনব্যবস্থা ইসলামি বিশুদ্ধতার দাবি করে, সেটি কি প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল?
রোজা : ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কার্যত শূন্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ কারণেই আমরা জোর দিয়ে বলি, প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা কেবল রক্ষণশীলতা নয়। এখানে পুরোনো প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারের কোনো বিষয় নেই। বরং নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা জড়িত। এই শাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তথাকথিত সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা এবং যেই বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়োগ দেয়- তার সবই ইরানের ইতিহাসে এবং বৃহত্তর ইসলামের ইতিহাসেও নজিরবিহীন।
ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজেকে গণতন্ত্রের এক ধরনের মুখোশে উপস্থাপন করে। সেখানে একটি পার্লামেন্ট আছে, কিন্তু ধর্মীয় নেতাদের অনুমোদন ছাড়া সেখানে আসন পাওয়া সম্ভব নয়। ধর্মীয় নেতারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থীদের যাচাই পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে শেষ কথা হলো ইরান নামমাত্র একটি প্রজাতন্ত্র। দেশটির বিপ্লবী চরিত্রের দিকটি হলো এটি সম্পূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
১৯৭৯ সালে ক্ষমতায় এসে আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রধান অগ্রাধিকার ছিল নারীদের নিয়ন্ত্রণে আনা। বাধ্যতামূলক হিজাব হয়ে ওঠে ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক’। কেন নারীদের পেছনে ঠেলে দিয়ে তাদের ওপর জাতীয় পরিচয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো?
রোজা : আসলে আলি শরিয়তি নিজেই আগে পশ্চিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিহ্ন হিসেবে নারীদের হিজাব পরতে উৎসাহিত করেছিলেন। অথচ তিনি পরতেন তিন টুকরো পাশ্চাত্য স্যুট। ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামপন্থীদের দৃষ্টিতে নারীরাই পুরুষ ও পরিবারের সম্মানের বাহক। একজন নারীকে হতে হবে শালীন, বিনয়ী, নিজেকে আচ্ছাদিত রাখতে হবে এবং অনৈতিক আচরণ করা চলবে না। তা না হলে পুরো পরিবার অসম্মানিত হবে। সেজন্য নারীর শরীর ক্ষমতার এক বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে। নারীরা যখন হিজাব পরে, তখন তা সবার সামনে পুরুষের কর্তৃত্ব প্রদর্শনের এক উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
ইহুদিবিদ্বেষ কীভাবে এমন পর্যায়ে বিকশিত হলো যে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের একটি স্তম্ভে পরিণত হলো?
রোজা: ১৯০৬ সালের বিপ্লবের পর শাহ ইহুদিদের অধিকার দিয়েছিলেন। তাদের জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার সুযোগও দেয়া হয়। ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইহুদিরা দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাজনৈতিক জীবনে সম্পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন।
তবে খোমেনির অধীনে খ্রিষ্টধর্মের মতোই ইসলামে বিদ্যমান ঐতিহ্যগত ইহুদিবিরোধিতার বিষয়টি পশ্চিম থেকে আমদানি করা আধুনিক ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিষয়টি এর আগে আমরা ব্যাখ্যা করেছি। এর ফলে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের শুরু থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার লক্ষ্যটি ইরানি শাসন ব্যবস্থার একটি আদর্শিক স্তম্ভ হয়ে ওঠে। ‘জায়নবাদীদের দ্বারা ফিলিস্তিন দখলের বিরুদ্ধে’ জিহাদকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য পবিত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাছাড়া ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে নতুন ধরনের ইহুদিবিরোধী বক্তব্য দেখা যায়। সে সময়ে ইউরোপীয় হলোকাস্ট অস্বীকারের তত্ত্বগুলো ব্যাপকভাবে ইরানে আমদানি করা হয়। বিশেষ করে রজে গারোদির ধারণা জনপ্রিয় হয়। গারোদি ১৯৯৬ সালে ‘দ্য ফাউন্ডিং মিথস অফ ইসরায়েলি পলিসি’ প্রকাশ করেন এবং এ কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। গারোদি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বন্ধুতে পরিণত হন। ইরানি রেজিম তাকে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার শহীদ’ হিসেবে বিবেচনা করত।
ইহুদিদের দ্বারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের সূত্রপাত ঘটে ১৯৪৮ সালে। ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও বারবার বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে।
আপনি কি বলতে যান পশ্চিমা অতি-বামপন্থীরা এখনও সেই আগের মতোই সরল বা বিভ্রান্ত, যেমনটি কিছু ইরানি বুদ্ধিজীবী অতীতে হয়েছিলেন?
তাভাক্কোলি : কতটা তা আমি ঠিক বলতে পারি না। তবে এটি স্পষ্ট তাদের কিছু নেতা ন্যয্যভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনায় দ্রুত এগিয়ে এসেছেন। অথচ ইসলামি প্রজাতন্ত্র জানুয়ারিতে যখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছিল তখন তারা নিরব ছিলেন।
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হস্তক্ষেপ কি উল্টো ফল দিতে পারে? ইরানি জনগণ কি তাদের হস্তক্ষেপকারী শক্তি হিসেবে দেখতে পারে?
রোজা : ইরানিরা সম্পূর্ণ হতাশার মধ্যে আছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশি হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। তবে সত্য হলো এই প্রশ্নে তারা বিভক্ত। কেউ কেউ মনে করেন, শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যেখানে বিদেশি সহায়তা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
শাসনব্যবস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানি জনগণের সম্পদ লুট করে নিজেদের বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। পশ্চিমা ব্যাংকে থাকা সেই সম্পদ এখনো জব্দ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাও খুব সীমিত। তাই কিছু মানুষের কাছে যুদ্ধকেই শেষ উপায় বলে মনে হচ্ছে, যদিও এটি ভয়াবহ বিষয়।
তাভাক্কোলি : অবশ্য নিপীড়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা ইরানে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে যা ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন, সেটি মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি তার কয়েক দশকের শাসনেও ঘটাতে পারেননি। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ইরানি সমাজকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক করে ফেলেছে। ইরানিরা স্বাধীন হতে চান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার চান। ধর্মীয় নেতাদের শাসনের অধীনেই সমাজ পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গেছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ কী? পাহলভি রাজবংশের প্রত্যাবর্তন কি বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প?
তাভাক্কোলি : বিভিন্ন সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। রেজা পাহলভি সেই বিকল্পগুলোর একটি। প্রবাসী ইরানি এবং নাগরিক সমাজের বড় একটি অংশ তার নাম উচ্চারণ করছে। পাহলভি একজন পরিচিত বিরোধী নেতা। এটাই তার শক্তি, আবার দুর্বলতাও। কারণ তিনি এমন একটি অতীতের সঙ্গে যুক্ত, যা সবসময় গৌরবময় ছিল না।
তবে ইরানের ভেতরেও একটি বিরোধী শক্তি রয়েছে। তারাও রূপান্তর প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে। কুর্দি রাজনৈতিক দলগুলোও বলেছে তারা জোট গঠন করতে প্রস্তুত, যাতে ইরানি জনগণ নিজেদেরকে বর্তমান শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করতে পারে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র স্পষ্টভাবেই একটি গভীর বৈধতা সংকটের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে মাত্র ১০-২০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি সেটিই প্রমাণ করে। আমরা আশা করতে পারি, এই অস্থিরতার মধ্যেও ইরানি সমাজ তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারবে, এবং শেষ পর্যন্ত জনগণই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবে।
চূড়ান্ত বিষয়টি হলো ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র ইরানিদেরই।