ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িঘড়ি নেওয়া ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ পরিকল্পনা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে পড়েছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ। তবে যুদ্ধের শুরুতেই বিশৃঙ্খলা ও অদূরদর্শিতার চিত্র ফুটে ওঠায় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অকেজো করা, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতেই পেন্টাগনের পুরনো তথ্য ব্যবহারের কারণে একটি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে পড়ে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ওপর। এতে ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র শত শত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও একটি ড্রোন কুয়েতের অস্থায়ী মার্কিন কমান্ড সেন্টারে আঘাত হানে। এতে ৬ মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক আটকা পড়েছেন। তাদের সরিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে এসব নাগরিক ও দূতাবাস কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কোনও যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।
মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিহত হয়েছেন। তবে এর পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কোনও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে কেবল বলেছেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন।’ কিন্তু এই ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে, তার কোনও দিকনির্দেশনা নেই।
পেন্টাগনের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের পূর্ববর্তী নীতির সম্পূর্ণ উল্টো।
বারাক ওবামার সময়কার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফিলিপ গর্ডন বলেন, এত অল্প পরিকল্পনায় এ ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন। ট্রাম্প কেন অবাক হচ্ছেন, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল রুবিন বলেন, সামরিক পরিকল্পনা হয়তো নিখুঁত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি একটি চরম বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যেকোনও অভিযানের প্রথম ধাপ হলো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। পেন্টাগন নয়, এই অস্পষ্টতার দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
সমালোচকরা বলছেন, ক্যারিয়ার কূটনীতিক ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ‘ডিপ স্টেট’ আখ্যা দিয়ে ছেঁটে ফেলার কারণেই এই সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ভয়াবহ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে নর্দমায় নিক্ষেপ করার শামিল, যার রেশ কয়েক দশক ধরে টানতে হবে।