আলজাজিরার ফিচার
পারস্য উপসাগরের প্রখর রোদে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এই বয়ে চলার ছন্দময় শব্দ প্রাচীন প্রবাল পাথরে নিয়মিত কম্পন সৃষ্টি করছে। এখানেই একসময় বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-ই-আহমেদ দাঁড়িয়ে নির্জন উপকূলের দিকে তাকিয়ে এই ভূখণ্ডকে পারস্য উপসাগরের ‘অনাথ মুক্তো’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
ইরানের বুশেহর প্রদেশের এই ২২ বর্গকিলোমিটারের প্রবাল দ্বীপটি বর্তমানে ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত গোপনীয়তায় আবৃত এবং এলিট ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দ্বারা সুরক্ষিত এই স্থানে প্রবেশাধিকার কেবল সরকারি নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্তদের জন্যই সীমাবদ্ধ।
তবে বিশাল ইস্পাত বেষ্টনী আর সামরিক নজরদারির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক আদিম ভূখণ্ড, যেখানে হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় মানব ইতিহাস আর ইরানের আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের হৃদস্পন্দন নীরবে সহাবস্থান করছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) ভোরে খারগ দ্বীপটি ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের সর্বশেষ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার দেশের বিমানবাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ভদ্রতার খাতিরে আমি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অবাধ ও নিরাপদ পথে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করে, আমি অবিলম্বে আমার এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।
পেট্রোলিয়ামের স্নায়ুকেন্দ্র
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিমি (৩৪ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮ কিমি) দূরে খারগ দ্বীপটি অবস্থিত। ইরানের অবিসংবাদিত অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত দ্বীপটি। দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। এই হিসাবে দ্বীপটি থেকে বছরে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়ে থাকে।
মাত্র ৮ কিমি দৈর্ঘ্য এবং ৪-৫ কিমি প্রস্থের এই দ্বীপটির চারপাশের গভীর জলভাগ একটি প্রাকৃতিক ভৌগোলিক সুবিধা প্রদান করে। এই গভীরতার কারণে বিশাল সুপারট্যাংকারগুলো নিরাপদে নোঙর করতে পারে এবং প্রধানত এশীয় বাজারের জন্য নির্ধারিত অপরিশোধিত তেল বোঝাই করতে পারে, যেখানে চীন শীর্ষ আমদানিকারক হিসেবে অবস্থান করছে।
ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, এই দ্বীপের স্থাপনাগুলো জ্বালানি খাতের অত্যাবশ্যকীয় স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই টার্মিনালটি তিনটি প্রধান অফশোর ক্ষেত্র—আবুজার, ফারুজান এবং দোরুদ থেকে অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করে। এরপর সেগুলো সমুদ্রতলের পাইপলাইনের এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থলভাগের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানোর আগে সংরক্ষণ বা জাহাজে তোলা হয়।
বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে উৎপাদন মাঝেমধ্যে ব্যাহত হলেও, ইরান এই দ্বীপের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এসএন্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস জানায়, তেহরান ২৫ এবং ২৬ নম্বর ট্যাংক দুটির সংস্কারের মাধ্যমে টার্মিনালটির সংরক্ষণ ক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে এই টার্মিনালগুলোর লোডিং ক্ষমতা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যদিও বর্তমানে জাতীয় রপ্তানির পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল।
সাম্রাজ্য ও নির্বাসন
হাইড্রোকার্বন বা তেল আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই এই দ্বীপের কৌশলগত সামুদ্রিক মূল্য বিজয়ীদের কাছে একে একটি লোভনীয় চাহিদায় পরিণত করেছিল। কেউ কেউ ভুলবশত ‘খারগ’ নামটিকে মহান আলেকজান্ডার কর্তৃক টাইগ্রিস ও কারখে নদীর মোহনায় (বর্তমান বসরার কাছে) প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন শহর ‘চ্যারাক্স স্পাসিনু’-এর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড নিশ্চিত করে যে, এগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় উপভাষা এবং ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম বিবর্তিত হয়েছে, যা বিভিন্নভাবে খারগ, খাক, খারাজ এবং খারেজ নামে নথিভুক্ত। এর প্রাকৃতিক সুপেয় পানির ঝরনা এবং চমৎকার অবস্থান একে একটি অপরিহার্য সামুদ্রিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছিল, যা কৃষি পণ্য ও খনিজ রপ্তানিতে সহায়তা করত।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে, পর্তুগিজরা প্রথম উপসাগরীয় অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে খারগের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ডাচদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখানে শিকড় ছড়ায়। ১৭৫২ সালে ডাচ ব্যারন নিপহাউসেন বন্দর রিগের শাসক মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেন। পরের বছর, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে। তবে এই ঔপনিবেশিক আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে বন্দর রিগের গভর্নর মীর মুহান্না সফলভাবে দুর্গটি আক্রমণ করেন এবং ডাচ বাহিনীকে চিরতরে বিতাড়িত করেন।
২০শ শতাব্দীতে দ্বীপের ইতিহাস একটি অন্ধকার মোড় নেয়, যখন ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের শাসনে থাকা রেজা শাহ পাহলভি এটিকে রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য একটি দূরবর্তী নির্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৯৫৮ সালের পর থেকে মূলত আধুনিক পেট্রোলিয়াম যুগের সূচনা হয়। দণ্ডায়মান অতীতের গ্লানি মুছে ফেলে খারগকে একটি বিশাল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত করা হয় এবং ১৯৬০ সালের আগস্টে এর নতুন গভীর সমুদ্র টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বড় চালান পাঠায়।
বৈচিত্র্যময় অতীতের সম্মিলন
খরগ দ্বীপের আধুনিক শিল্পায়িত রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এখানে মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগ থেকে, যা এলামাইট, আচেমেনিড এবং সাসানিদ যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এর সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে একটি হলো মীর মোহাম্মদ মাজার, যা সপ্তম হিজরি শতকের শেষের দিকে পাথর ও কাদা দিয়ে তৈরি দুটি মোচাকৃতি গম্বুজ নিয়ে নির্মিত। এর কাছেই অবস্থিত মীর আরাম মাজার, যেখানে ১২ মিটারের একটি পাথর রয়েছে যাতে ইসলামি লিপি খোদাই করা এবং দুটি মশাল রয়েছে যা আচেমেনিড আমলের বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়রা এই স্থানটিকে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নূহ (আ.)-এর বংশধর মীর আরামের সঙ্গে যুক্ত করেন।
এই দ্বীপটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের এক জীবন্ত দলিল। একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কবরস্থানে বিভিন্ন ধর্মের এক অপূর্ব সহাবস্থান দেখা যায়, যেখানে জরাথুস্ট্রবাদী (মজুসি) সমাধি, খ্রিস্টানদের কবর এবং সাসানিদ আমলের সমাধি রয়েছে।
দ্বীপের অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ডাচ বাগান, খারগ ফলের বাগান, একটি পুরোনো রেলপথ এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আচেমেনিড শিলালিপি। প্রবাল পাথরের ওপর খোদাই করা এই লিপিটি ৮৫ বাই ১১৬ সেন্টিমিটারের, যা ‘পারস্য উপসাগর’ নামটির অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃত।
খারগ দ্বীপ তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ভারী ক্ষত বহন করছে। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এটি নিরলস ও বিধ্বংসী বোমা হামলার শিকার হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইরানি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত পরিশ্রমের সঙে্গ পুনর্নির্মাণ করে। আজ যখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বারবার এই অঞ্চলের জলপথকে হুমকির মুখে ফেলছে, দ্বীপটি এখনও ব্যাপকভাবে সামরিক শাসনের মধ্যে রয়েছে, যা পর্যটকদের দূরে রাখলেও পরোক্ষভাবে এর আদিম প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করছে।
লেখক: মোহাম্মদ মনসুর,বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
আলজাজিরার ফিচার বিভাগ থেকে অনূদিত