দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ চালু হয়েছিল। কিন্তু নতুন মেয়াদ শুরু হতেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) মেয়াদও শেষের পথে।
তা সত্ত্বেও, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই নতুন নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন বা কমিটি গঠন করা হয়নি। আর কবে ভোট হতে পারে সে বিষয়েও মেলেনি কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই অনিশ্চয়তা মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব কমে আসার চিত্রই তুলে ধরে। দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৬টিতেই ছাত্র সংসদ গঠনের কোনো আইনগত নিয়ম নেই।
কয়েক বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুরু হলেও, নব্বইয়ের দশক থেকে হারিয়ে যাওয়া কলেজগুলোর নির্বাচন চালু করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা একদম কমে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘ছাত্র সংসদ না থাকলে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নষ্ট হয়। প্রশাসন বা সরকার যাতে জোরজবরদস্তি করে শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই ছাত্র সংসদের কাজ।’
নতুন নির্বাচনের লক্ষ্মণ নেই
২৯ বছর বন্ধ থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচন টানা ছয় বছর আটকে থাকে। সবশেষ ডাকসু কমিটির মেয়াদ গত ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ৯০ দিন বা নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত (যেটি আগে হয়) দায়িত্বে থাকতে পারেন। তবে এর মধ্যে নতুন নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা না হলে সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বললেও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা করেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলমুজাদ্দেদ আলফেসানি টাইমসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ চার কর্মকর্তা বর্তমান ডাকসু কমিটির সঙ্গে বসেছেন এবং হল প্রভোস্টদের কাছে সার্বিক পরিস্থিতির প্রতিবেদন চেয়েছেন।
তিনি জানান, ‘প্রশাসন সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গেও আলোচনায় বসবে।’ তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল কবে ঘোষণা করা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।’
ডাকসু সদস্য মো. শাহিনুর রহমান জানান, নির্বাচনের তারিখ জানতে তারা বারবার উপাচার্যের কাছে গেলেও জানানো হয়েছে এই সিদ্ধান্ত তার এখতিয়ারের বাইরে।
এমনকি অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে ডাকসু নির্বাচন যুক্ত করার যে দাবি ছিল, সেটিরও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান শাহিনুর রহমান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ৩৩ বছর পর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। ১৮ সেপ্টেম্বর কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচনের কোনো তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর মনে করেন, আর্থিক সংকট, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সরকারের নানা হিসাব-নিকাশের কারণে এই দেরি হতে পারে।
সম্প্রতি নির্বাচনের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া জাতীয় ছাত্র শক্তি জাবি শাখার সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, আর্থিক সংকটের দোহাই দিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও ৩৫ বছর পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন করেছিল। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। অথচ এখনো নির্বাচন কমিশন গঠন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, তফসিল ঘোষণার কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
গত বছরের নির্বাচনের আগে জয়ী শিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ নিয়মিত ভোট নিশ্চিত করতে রাকসু নির্বাচনকে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছিল।
রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ অভিযোগ করেন, প্রশাসন আসলে রাজনৈতিক সরকারের ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষায় বসে আছে।
তিনি বলেন, ‘প্রশাসন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাকসু নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।’
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সংসদ সক্রিয় রাখা জরুরি।
উপাচার্য মো. ফরিদুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, নির্বাচন বহু কিছুর ওপর নির্ভর করে। মেয়াদ শেষ হলেই নির্বাচন করে ফেলা যায় না। ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুকূলে থাকতে হয়।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শেষ হচ্ছে চাকসুর মেয়াদ। তবে নতুন নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ও সংসদের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান টাইমসকে বলেন, পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিবের মতে, মেয়াদ শেষের তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া উচিত।
অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ কমিটির মেয়াদ এখনো রয়েছে, যা শেষ হবে ২০২৭ সালের ৬ জানুয়ারি।
বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনি ব্যবস্থা নেই
আইন অনুযায়ী ছাত্র সংসদ রয়েছে এমন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেও কোনো নির্বাচন করেনি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, নির্ধারিত ভোটের ঠিক একদিন আগে ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট ভোটগ্রহণ চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে। এরপর আর সেই নির্বাচন আলোর মুখ দেখেনি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করলেও বুয়েট শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহ কম দেখা গেছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম টাইমসকে বলেন, শিক্ষার্থীরা সংসদ ফেরত চায়। প্রশাসনের এতে আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। দ্রুতই একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ ছাত্ররাজনীতির বিরোধী। তাদের ভয়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ফের দলীয় রাজনীতি ঢুকে পড়তে পারে।
অন্যদের যুক্তি, অন্যান্য সাধারণ কল্যাণমূলক সংগঠনের মতো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াও ছাত্র সংসদ চালানো সম্ভব।
সবচেয়ে বড় আইনি জটিলতা হলো—দেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদের কোনো কথা বলা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, আইনি বিধান ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হুট করে নির্বাচন দিতে পারে না। সিন্ডিকেট সভা করে নিয়ম যুক্ত করা সম্ভব হলেও, সরকারের ‘সবুজ সংকেত’ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ থেকে ঝুঁকি নিতে চায় না।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তার মতে, নির্বাচনের জন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব সিন্ডিকেট সভায় নিয়ম পাশ করে সহজেই নির্বাচন করতে পারে। এতে কোনো আইনি বাধা নেই।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র সংসদের দাবি জানিয়ে আসছেন।
হারিয়ে গেছে কলেজের নির্বাচন
আশির দশকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি কলেজেও বেশ আমেজ নিয়ে নির্বাচন হতো। কিন্তু বর্তমানে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনার বাইরে চলে গেছে।
ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) এ এন রাশেদা বলেন, একসময় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংসদ ছিল। পরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বজায় রাখতে ছাত্র সংসদকে বাধা মনে করে। তাই নিয়মিত নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, সদিচ্ছা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কলেজগুলোতে এক সঙ্গেই নির্বাচনের আয়োজন করা যেত।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, তাদের কাঠামোটাই আলাদা। কারণ অধিভুক্ত কলেজগুলোর মাধ্যমে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ালেখার পরিবেশ তৈরি করা, সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ দেওয়া এবং চাকরির বাজারের জন্য তাদের যোগ্য করে তোলা।’
(প্রতিবেদন তৈরিতে ঢাবি, জাবি, রাবি, চবি এবং জবি প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)