Image description

ঢাকার একটি পত্রিকার রাজশাহী প্রতিনিধি রিমন রহমান সম্প্রতি গণপূর্ত বিভাগ-২ এর একটি নির্মাণ প্রকল্পের তথ্য চান। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরাসরি কিছু না জানিয়ে তাকে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে বলেন।

রিমনের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল ওই প্রকল্পের আওতায় দুবাই থেকে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কেনার কথা থাকলেও এসেছে ভারত থেকে। আর ৩০০ কেএলডি ক্ষমতার জায়গায় কেনা হয়েছে ২৪০ কেএলডির প্ল্যান্ট।

টাইমস অব বাংলাদেশ’কে রিমন বলেন, ‘কর্মকর্তারা সব জানেন, বললেই পারতেন। কিন্তু তথ্য দেবেন না বলে আবেদন করতে বললেন। এক মাসের বেশি হয়ে গেছে, এখনো কোনো উত্তর পাইনি।’

২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন করার সময় বলা হয়েছিল, সাধারণ মানুষ সহজে সরকারি তথ্য পাবে। নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে ২০ দিনের মধ্যে তথ্য দেওয়ার কথা, আর অন্য দপ্তর জড়িত থাকলে সময়সীমা ৩০ দিন।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়মকে এখন তথ্য না দেওয়ার বাহানা হিসেবে ব্যবহার করছেন কর্মকর্তারা। রিমন রহমান বলেন, ‘আগে বরং সহজে তথ্য পাওয়া যেত। এখন ছোটখাট বিষয়েও আরটিআই আবেদন করতে বলা হয়। বিশেষ করে অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য চাইলে একদমই দেওয়া হয় না। শুধু পুলিশ ছাড়া সব দপ্তরেই এমন অবস্থা। একটা সংবাদের জন্য এক মাস অপেক্ষা করলে খবর তো আর খবর থাকে না।’

শুধু কর্মকর্তা নয়, তথ্য গোপন করার প্রবণতা সরকারের ভেতরেও দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই দফায় ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি বাংলাদেশ সরকার গোপন রাখলেও পরবর্তীতে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ করা তথ্য থেকে জানা যায়। সম্প্রতি সই হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির শর্ত সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু জানায়নি সরকার। বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা দাবি করেছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, তবে সে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।

 

পাশাপাশি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সরকারি ওয়েবসাইট থেকে আগের সরকারের নথিপত্র মুছে ফেলার প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আগের সরকারের প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নথি সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানেও বেশ কিছু তথ্য ও নথি আর পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাইট থেকে কর্মকর্তাদের নাম ও আইডি নম্বর সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে কতজন কর্মকর্তা ওএসডি হয়ে বেতন পাচ্ছেন বা চুক্তিতে আছেন, সে হিসাব এখন আর সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তথ্য কমিশন নিষ্ক্রিয়। অন্তর্বর্তী সরকার তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ সংশোধন করলেও নতুন বিএনপি সরকার তাতে অনুমোদন দেয়নি। ফলে দেশ পুরনো ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেলেও এখনো নতুন কমিশন গঠিত হয়নি। প্রধান তথ্য কমিশনার নিয়োগে গত ১১ জুন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘আইন থাকা সত্ত্বেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে তথ্য কমিশন না থাকা একটা বিব্রতকর নজির। পর পর দুটি সরকার দায়িত্ব পালন করলেও কমিশন গঠন করতে না পারা সরাসরি আইন অমান্যের শামিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য কমিশনকে অকার্যকর রাখার মাধ্যমে সরকার মূলত জবাবদিহি এড়িয়ে চলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার খর্ব হচ্ছে।’

বর্তমানে তথ্য কমিশনে প্রায় সাড়ে আটশ আবেদন জমা পড়ে থাকলেও কোনো কার্যক্রম নেই। কতদিনের মধ্যে কমিশন গঠন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন কমিশন কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমানকে ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিক, আবেদন করেও ভোগান্তিতে পড়ার কথা জানান রিমন রহমান। অনিয়মের তথ্য চেয়ে আবেদন করলে প্রায়ই ওপর থেকে চাপ ও অপপ্রচার শুরু হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আবেদন করার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা থেকে শুরু করে ঠিকাদাররা এসে কাজ নেওয়ার বিনিময়ে আবেদন তুলে নিতে প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত অকার্যকর কিছু তথ্য দেওয়া হলে রিমন জানান, তিনি এর বিরুদ্ধে আপিল করবেন।