ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ক্লাসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের মূল উদ্দেশ্য শেখা নয়, বরং অ্যাটেনডেন্স নিশ্চিত করা—এমন তথ্য উঠে এসেছে এক জরিপে। এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী মূলত অ্যাটেনডেন্স দেওয়ার জন্য ক্লাসে যান। বিপরীতে মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী কেবল শেখার উদ্দেশ্যে ক্লাসে অংশ নেন।
জরিপে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বাকি ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে অ্যাটেনডেন্স ও শেখা—দুই বিষয়ই ক্লাসে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স (ডিইউএসএ) নামে একটি সংগঠন এ জরিপ পরিচালনা করেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
কোনো কোনো কোর্সে মাত্র দুইটি ক্লাস অনুপস্থিত থাকলেও অ্যাটেনডেন্সের নম্বর থেকে এক নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। ফলে কয়েকটি ক্লাস মিস করলেই উপস্থিতির জন্য নির্ধারিত পূর্ণ পাঁচ নম্বর হারানোর আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী শেখার চেয়ে উপস্থিতির নম্বর ও পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা নিশ্চিত করতেই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
অ্যাটেনডেন্সের বাধ্যবাধকতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ক্লাসে উপস্থিতির নিয়মে ভিন্নতা রয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আবার কিছু বিভাগে পরীক্ষায় বসার যোগ্যতার পাশাপাশি ক্লাসে উপস্থিতির ওপর নম্বরও নির্ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, কোনো কোনো কোর্সে মাত্র দুইটি ক্লাস অনুপস্থিত থাকলেও অ্যাটেনডেন্সের নম্বর থেকে এক নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। ফলে কয়েকটি ক্লাস মিস করলেই উপস্থিতির জন্য নির্ধারিত পূর্ণ পাঁচ নম্বর হারানোর আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী শেখার চেয়ে উপস্থিতির নম্বর ও পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা নিশ্চিত করতেই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
‘ক্লাসে যাই, কিন্তু শেখার মতো কিছু পাই না’
শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির এই প্রবণতাকে কেবল তাদের অনাগ্রহ বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না অনেকে। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, তারা শেখার উদ্দেশ্যে ক্লাসে গেলেও অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে প্রত্যাশিত শিক্ষণীয় পরিবেশ বা উপকরণ খুঁজে পান না।
জরিপে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, প্রতি পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে গড়ে একজন শিক্ষকের ক্লাসে তারা প্রকৃত অর্থে শেখার মতো বিষয়বস্তু ও কার্যকর পাঠদান খুঁজে পান। ফলে অ্যাটেনডেন্সের বাধ্যবাধকতা না থাকলে অনেক শিক্ষার্থীই নিয়মিত ক্লাসে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন বলে তাদের মত।
প্রশ্ন উঠছে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে
শিক্ষার্থীদের এমন অভিজ্ঞতা দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কেবল উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার কারণে শ্রেণিকক্ষে যায় এবং শেখার উদ্দেশ্যে যাওয়ার হার এত কম থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতি কতটা কার্যকর—সে প্রশ্ন সামনে আসছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষকে এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শেখার আগ্রহ নিয়ে ক্লাসে অংশ নেন।
শিক্ষক মূল্যায়ন ও পাঠদানে বৈচিত্র্যের দাবি
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সে প্রক্রিয়া পরবর্তীতে আর এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, শিক্ষাদানের মান উন্নয়নে নিয়মিত ও কার্যকর শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে যেসব বিভাগের প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে একঘেয়ে বা অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, সেসব ক্ষেত্রে আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাদান পদ্ধতি চালুর দাবি উঠছে। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, উপস্থাপনা, ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষাদানের মাধ্যমে পাঠদানকে আরও কার্যকর করার পরামর্শও দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, শুধু অ্যাটেনডেন্স নিশ্চিত করার জন্য নয়—জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা উন্নয়ন ও চিন্তার বিকাশের জন্যই যেন শ্রেণিকক্ষে আসতে আগ্রহী হন শিক্ষার্থীরা। আর সে পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—সবার।