Image description

ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবন যেন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ধারণাকেই এক ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যে মানুষটি কখনও স্কুলে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস করেননি, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও অর্জন করেননি, তিনিই স্বাধীনতার পর ভারতের শিক্ষা কাঠামোর ভিত গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁর সময়েই উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও গবেষণার জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হওয়ায় আজাদের শিক্ষাভাবনাও আবার আলোচনায় এসেছে। তাঁর জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে - প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেয়েও তিনি শিক্ষাকে দেখেছিলেন ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে।

স্কুল নয়, ঘরই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষালয়। ১৮৮৮ সালে মক্কায় জন্ম আবুল কালাম আজাদের। তাঁর বাবা মাওলানা খাইরুদ্দিন ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী ব্যক্তি। শৈশবে বাবার সিদ্ধান্তেই আজাদের প্রচলিত স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। বাড়িতেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। আরবি ও ফারসির পাশাপাশি তিনি ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, গণিত, জ্যামিতি ও বীজগণিত শেখেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় এসে তাঁর পড়াশোনার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। শিক্ষা অবশ্য তাঁর কাছে শুধু পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজে নিজেই ইংরেজি শেখেন, সংবাদপত্র পড়েন এবং পাশ্চাত্য দর্শন, ইতিহাস ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে পরিচিত হন। স্যার সৈয়দ আহমদ খানের লেখাও তাঁর চিন্তার জগতে প্রভাব ফেলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও এভাবেই তৈরি হয় তাঁর বিস্ময়কর জ্ঞানভাণ্ডার।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি রুরকির একটি জীবনীমূলক নথিতেও উল্লেখ রয়েছে, আজাদকে প্রথমে তাঁর বাবা এবং পরে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকরা বাড়িতে পড়িয়েছিলেন। আজাদের প্রতিভার প্রকাশ ঘটে অতি অল্প বয়সেই। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ‘লিসান-উস-সিদক’ নামে একটি সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১২ সালে প্রকাশ করেন উর্দু পত্রিকা ‘আল-হিলাল’। ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা, স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দ্রুতই তাঁকে ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরে নিয়ে আসে। ব্রিটিশ সরকার নানা চাপ সৃষ্টি করলে ‘আল-হিলাল’ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি ‘আল-বালাগ’ প্রকাশ করেন। সেটিও বেশিদিন চলতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাঁচির কাছে নির্বাসিত করা হয়। সাংবাদিকতা তাই তাঁর কাছে শুধু পেশা ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের হাতিয়ার। লেখালেখির মধ্য দিয়েই তিনি বৃহত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

পরবর্তী সময়ে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন আজাদ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, ১৯২৩ সালে তিনি কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত আবার কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন তিনি। এই সময় ভারত ভাগের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের বিরোধিতা করেন আজাদ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ ইতিহাস, ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একটি অভিন্ন জাতিসত্তার ভিত্তি হতে পারে। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারতকে এক রাখার চেষ্টাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশভাগ ঠেকানো যায়নি।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দেশজুড়ে ছিল সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উদ্বাস্তু সংকট এবং অনিশ্চয়তা। দেশভাগ আজাদকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। তখন ভারতের সামনে শিক্ষার চিত্র ছিল কঠিন। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, শিক্ষকের ঘাটতি, সীমিত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আজাদের কাছে তাই শিক্ষা মানে শুধু স্কুল-কলেজ চালানো নয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, গবেষণা ও মানবিক শিক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। এই ভাবনার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে খড়্গপুরের প্রতিষ্ঠানটি। আইআইটি খড়্গপুরের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। নলিনী রঞ্জন সরকার-নেতৃত্বাধীন কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুপারিশ করে। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে খড়্গপুরের হিজলিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। ব্রিটিশ আমলে যেখানে রাজনৈতিক বন্দিদের আটক রাখা হতো, সেই হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্পই পরে হয়ে ওঠে ভারতের প্রথম আইআইটির ঠিকানা। ১৯৫১ সালের ১৮ আগস্ট মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। প্রথম দিকে সেখানে ছিলেন ২২৪ জন শিক্ষার্থী ও ৪২ জন শিক্ষক।

তবে আইআইটি খড়্গপুরকে একা আজাদের কীর্তি বলা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। নলিনী রঞ্জন সরকার কমিটি, জওহরলাল নেহরু, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং প্রশাসনের একাধিক ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখার যে রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেখানে আজাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ইউজিসি গঠনের পথও তাঁর সময়েই। স্বাধীন ভারতের উচ্চশিক্ষার কাঠামো গঠনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। ১৯৪৮-৪৯ সালে এস রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান, সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে কমিশন বিভিন্ন সুপারিশ করে। ১৯৫৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ইউজিসির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরে ১৯৫৬ সালে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে ইউজিসি আইনি মর্যাদা পায়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়, অনুদান এবং শিক্ষার মান নির্ধারণে যে জাতীয় কাঠামো আজ ভারতের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় আজাদের মন্ত্রিত্বের সময়।

আজাদের শিক্ষাভাবনা কেবল প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও সংস্কৃতিকেও জাতীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতেন। তাঁর সময়েই সাহিত্য আকাদেমি, ললিত কলা আকাদেমি ও সংগীত নাটক আকাদেমির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস বা আইসিসিআরের প্রথম সভাপতি ছিলেন আজাদ এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। সংস্থাটির সরকারি ইতিহাসেও নেহরু ও আজাদের নেতৃত্বে ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। আজাদের ব্যক্তিগত জ্ঞানভাণ্ডারেরও ছিল বিস্ময়কর ব্যাপ্তি। আইসিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের প্রায় ১০ হাজার বইয়ের সংগ্রহ সংস্থাটিকে দান করেছিলেন। এর মধ্যে আরবি, ফারসি ও উর্দুর বহু দুর্লভ বই ও পাণ্ডুলিপি ছিল।

যিনি কোনো স্কুলে পড়েননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেননি, তিনি কীভাবে একটি দেশের শিক্ষামন্ত্রী হলেন? এর উত্তর তাঁর নিজের শিক্ষাজীবনেই লুকিয়ে আছে। আজাদ ছিলেন ব্যতিক্রমী স্বশিক্ষিত মানুষ। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নিজের মতো করে শিক্ষিত হওয়ার গল্পকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প বানানো নয়। বরং তিনি চেয়েছিলেন, যে সুযোগ তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাননি, সেটিই যেন দেশের সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি হয়। আজ ভারতের আইআইটি ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। ইউজিসি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। আর শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও গবেষণাকে রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখার যে ধারণা স্বাধীনতার প্রথম দশকে তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন আবুল কালাম আজাদ। আইআইটি খড়্গপুরের সরকারি ইতিহাসও তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। ২০০৮ সাল থেকে তাঁর জন্মদিন, ১১ নভেম্বর, ভারতে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। ফলে আজাদ শুধু ইতিহাসের পাতায় থাকা স্বাধীনতা সংগ্রামী বা দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী নন। ভারতের শিক্ষা-ভাবনার সঙ্গে তাঁর নাম এখনও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। জীবনে তিনি কোনো স্কুলের বেঞ্চে বসেননি। কিন্তু স্বাধীনতার পর এমন একটি দেশের শিক্ষার ভিত গড়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের কোটি কোটি মানুষ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দরজা দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।