Image description
আন্দোলন জোরদার করতে নীল দলের কয়েকজন শিক্ষকদের বৈঠক © সংগৃহীত

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রচারণা ও মানববন্ধনের আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বিভাগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আজ রবিবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অংশগ্রহণের জন্য ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হয়। বিভাগের নোটিশ গ্রুপে এক শিক্ষার্থী লিখেন, আগামীকাল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়ার জন্য সকাল ১১টায় গোলচত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে। সবাই অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন। 

এছাড়া বিভাগের ডিবেটিং ক্লাবের মেসেঞ্জার গ্রুপেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানানো হয়। সেখানে একজন শিক্ষার্থী লেখেন, নোবিপ্রবির নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিই যেন ট্রেজারার পদে প্রাধান্য পান। সবাই এ বিষয়ে পোস্ট বা কমেন্ট করবেন। স্যার (অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ) আমাদের মডারেটর। স্যার ট্রেজারার হলে ক্লাবের জন্য ভালো হবে, প্রয়োজনে আমরা স্যারের সহযোগিতাও পাব।

ডিবিএ ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের একটি গ্রুপেও একই ধরনের প্রচারণার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ফটোকার্ড ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে এবং জুনিয়রদেরও একই কাজে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। পোস্টে সরাসরি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষককে ট্রেজারার হিসেবে চাই-এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে, কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে অধ্যাপক কাইয়ুম মাসুদের বৈঠকের অভিযোগও উঠেছে। ‘ÔNSTU Detective BranchÕ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়, নোয়াখালীর পৌরবাজারের একটি দোকানে কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করতে নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাদশা মিয়া (অব্যাহতিপ্রাপ্ত), বিজিই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত), মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিন, সহকারী অধ্যাপক মীর সালমা আক্তার, ওশানোগ্রাফি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মমিন সিদ্দিক এবং সহকারী অধ্যাপক মো. আবিদ হাসান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বৈঠকের একপর্যায়ে অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদও সেখানে যোগ দেন।

এর আগে, একই ইস্যুতে রবিবার সকাল ১১টায় শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক মো. জামসেদুল আলম। তিনি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের উদ্যোগ পীড়াদায়ক ও লজ্জাজনক। তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনে একাই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। তবে পরে সমালোচনার মুখে তিনি কর্মসূচি স্থগিত করেন।

শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পদ-পদবি পাওয়ার লড়াইয়ে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করাকে ভালোভাবে দেখছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনিক পদে কে নিয়োগ পাবেন, সেটি সরকারের বিষয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা কিংবা কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত স্বার্থে আন্দোলনে নামানো অনাকাঙ্ক্ষিত। তাদের অভিযোগ, বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীকে প্রভাব খাটিয়ে এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ ব্যক্তিস্বার্থে অতীতেও শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছেন। ভয়ভীতি ও প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ নতুন নয়। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিব্রত।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের। আমরা আশা করি, সরকার যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেবে।

অভিযোগের বিষয়ে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ বিরোধী শিক্ষকরা এসব কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত। বাস্তবে এমন কিছু ঘটেনি। বরং গতকাল একজন শিক্ষক একটি মানববন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর আমরা তাকে বলেছি, এভাবে কোনো কর্মসূচি দেওয়া ঠিক হবে না। পরে তিনি নিজেই কর্মসূচিটি বাতিল করেছেন। আমাদের কাছে এটাই তথ্য।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, আমি নাকি নিজের প্রচারণার জন্য বিভাগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছি। কিন্তু আমাদের বিভাগের কোনো অফিসিয়াল ফেসবুক পেজই নেই। যেসব পেজ রয়েছে, সেগুলো শিক্ষার্থীরা পরিচালনা করে। শিক্ষকদের কোনো পেজ নেই এবং শিক্ষার্থীদের পরিচালিত পেজের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই।’

ডিন আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের কোনো দাবি বা মতামত প্রকাশ করতে চায়, সেটি তো সরকারবিরোধী, বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী বা উপাচার্যবিরোধী কোনো বিষয় নয়। তারা যদি তাদের মনের কথা জানাতে চায়, তাহলে শিক্ষক হিসেবে তাদের তা বলতে নিষেধ করার সুযোগ আমাদের নেই। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগেই মতামত প্রকাশ করছে। কিন্তু সেটিকে আমার দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত বলা হচ্ছে, যা সঠিক নয়।’