গত দুই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো ইরানে বিমান হামলায় বিরতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সুযোগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারীরা। অন্যদিকে ইরানে ভারী বোমা হামলা আপাতত বন্ধ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরানপন্থি বিদ্রোহীগোষ্ঠী হুথি।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, হুতি যোদ্ধারা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইরান অভিযোগ করেছে, কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। হামলায় এক নাবিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্থানীয় সময় শনিবার জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নৌ অবরোধ ‘সম্পূর্ণ কার্যকর’ রয়েছে। তবে টানা ১৩ রাত ধরে ক্রমবর্ধমান হামলার ধারাবাহিকতা কেন হঠাৎ থেমে গেল, সে বিষয়ে তারা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
হামলায় বিরতির কারণ জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই স্পষ্ট করে বলেছেন, তার প্রথম পছন্দ কূটনীতি। তবে তিনি ইরানকে দেখিয়ে দিয়েছেন, তারা যদি আন্তরিকভাবে আলোচনার টেবিলে না আসে, তাহলে কী ঘটতে পারে।’
শনিবার ইরানের পক্ষ থেকেও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান এর আগে প্রতিদিনই বাহরাইন, জর্ডান, কাতার, কুয়েতসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে আসছিল।
নিউইয়র্ক টাইমস দুই মার্কিন সুত্রের বরাতে জানায়, আপাতত ইরানের ওপর হামলা আরও জোরদার করার বিষয়ে আগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত কমে যেতে পারে, পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে বিস্ফোরণে এক নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগরে ‘দূরপাল্লার হামলার’ সফলতার প্রশংসা করেন। তিনি সামরিক মালামাল বহনকারী জাহাজের কথা ইঙ্গিত করলেও লক্ষ্যবস্তু জাহাজগুলোর জাতীয়তা উল্লেখ করেননি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, তেহরানে ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই হামলার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা এ ঘটনাকে ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ হামলা বলে বর্ণনা করেছে।
ইরানের এ নিন্দার সময়ই জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য ইরানকে দিচ্ছে, যাতে তারা ওই অঞ্চলে হামলা পরিচালনা করতে পারে।
তবে পারস্য উপসাগরে সাময়িক শান্ত পরিস্থিতির মধ্যেও শনিবার হুতি বাহিনী ও সৌদি আরবের সংঘর্ষ ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে দ্বিতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
হুতি বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জানান, তাদের বাহিনী সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুর স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, জিজানের আরামকো শোধনাগারের দিক থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে।
এশিয়াভিত্তিক দুটি জ্বালানি বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে, জিজানের জ্বালানি ও তেল সংরক্ষণ স্থাপনায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাদের অবহিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে আরামকো কোনো সাড়া দেয়নি।
অন্যদিকে ইয়ানবুতে তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবে গ্রিসের সেনাবাহিনী ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে গ্রিসের নিরাপত্তা সূত্র। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
লোহিত সাগর তীরবর্তী সৌদি আরবের প্রধান তেলবন্দর ইয়ানবু বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে। কারণ, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করায় সৌদি তেল এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হচ্ছে।
ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর জিজানের তেল শোধনাগারে প্রতিদিন সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিমান বাহিনী মারিব ও আল-জাওফ প্রদেশে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং অস্ত্রগুদামে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনের কর্মকর্তারা।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা শুক্রবার লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর হোদেইদায় হুতিদের সামরিক অবস্থানগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে জোটের দাবি, তারা বন্দর স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।
ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গৃহযুদ্ধের উভয় পক্ষই সামনের সারিতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে।
ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব।
এই গৃহযুদ্ধে সংঘর্ষ ও দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত স্থগিত থাকলেও চলতি মাসে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত পাঁচ মাস ধরে ইরান যে বৃহত্তর যুদ্ধ চালিয়ে আসছে, তাতে কার্যত যোগ দিয়েছে হুতি বাহিনী।
গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে হুতিরা। হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি বলেছেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালায় হুতি বাহিনী।
অন্যদিকে সম্প্রতি ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের নৌ অবরোধও আবার শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার ওমান উপসাগরে তাদের নৌ অবরোধ অমান্য করে বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি জাহাজকে অচল করে দেওয়া হয়।