Image description

জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তবুও হাল ছাড়েননি। পা দিয়েই সংসারের সব কাজকর্ম করে যাচ্ছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আয়েশা আক্তারকে (৩০) দমাতে না পারলেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান বাবা-মা।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সাঘাটা ইউনিয়নের কচুয়ার নিভৃত গ্রামে ১৯৯৫ সালে আয়েশা আক্তারের জন্ম। ২০২৪ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেছেন। পা দিয়েই স্বপ্ন জয় করার চেষ্টা করতে থাকা আয়েশার আশা সরকারি চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়া।

শাজেদা ও আব্দুল লতিফ দম্পতির সন্তান আয়েশা। তারা চার বোন। আয়েশা তৃতীয়। অন্যান্য বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। দেড় বছর আগে বাবাকে হারিয়ে বর্তমানে সংসারে আছেন তিনি আর তার মা।

পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস, আয়েশার জীবনের একমাত্র আশা সরকারি চাকরি

 

ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার স্বপ্ন ছিল আয়েশার। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর বাবা আব্দুল লতিফ তাকে সার্কাসে দিয়ে দিতে চাইলেও রাজি হননি আয়েশা। সব বাধা অতিক্রম করে পা দিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগ পেয়ে ডিগ্রি পাস করে সদ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সও সম্পন্ন করেন।

সরেজমিনে আয়েশা আক্তারের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই হাত না থাকলেও আয়েশা নিজের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই পা দিয়েই করছেন। পায়ের আঙুলের সাহায্য কুলা দিয়ে চাল ঝাড়ছেন। বটিতে তরকারি কাটছেন। পা দিয়েই খাতায় লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এলাকাবাসী জানায়, দু’হাত বিহীন জন্ম নেওয়া আয়েশা আক্তার এখন তার এলাকার জন্য দৃষ্টান্ত। মানসিক ও সামাজিক বাধাকে অতিক্রম করে স্বপ্নের রাস্তায় পা দিলেও অভাব এখন তার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি চাকরি মুছে দিতে পারে তার সব কষ্ট।

 

প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, অনেকেই আসে, ভিডিও করে নিয়ে যায়, ছবি তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে মেয়েটার জন্য তেমন কেউ কিছু করে না। অথচ আয়েশা পা দিয়েই সংসারের সব কাজ করে। কেউ যদি একটা চাকরি দিত মেয়েটার গতি হতো।

আয়েশার চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও কখনো হাল ছাড়েনি। আমরা চাই তার একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ দিতো, তাহলে সে সম্মানের সঙ্গে নিজের জীবন চালাতে পারত।

পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস, আয়েশার জীবনের একমাত্র আশা সরকারি চাকরি

আয়েশার মা সাজেদা বেগম বলেন, জন্মের পর অনেক মানুষ অনেক কথা বলেছে। কেউ বলেছে, এই মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কিন্তু আমি কখনো আমার মেয়েকে অভিশাপ মনে করিনি। আল্লাহ যেভাবে দিয়েছেন, সেভাবেই মানুষ করার চেষ্টা করেছি। আজ সে পা দিয়ে লেখাপড়া করে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। কেউ যদি দয়া করে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতো, তাহলেও আমি মরেও শান্তি পেতাম। আপনাদের সবার কাছে একটা চাওয়া, আমার মেয়েটার যোগ্যতা অনুযায়ী সরকার একটা চাকরির ব্যবস্থা করুক।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা আক্তার বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। আমি ভিক্ষা চাই না, আমি আমার যোগ্যতায় একটা চাকরি চাই। সরকার যদি আমার মতো অসহায় শিক্ষিত মানুষের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের পাশে থাকতে পারতাম।

তিনি আরও বলেন, মানুষ দান-সদকা করে, সাহায্য করে। কিন্তু আমার মতো একজন শিক্ষিত মানুষের জন্য যদি একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়তা হতো।

পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস, আয়েশার জীবনের একমাত্র আশা সরকারি চাকরি

‎সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, আয়েশার বিষয়টি সত্যিই মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তার মতো একজন মেধাবী ও সংগ্রামী মেয়ের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রাখবো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করবো।

সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর বলেন, আয়েশা আক্তারের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে, আমরা ঈদের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে তাকে কিছু সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে।

 

 

তিনি আরও বলেন, আয়েশা অত্যন্ত মেধাবী ও সংগ্রামী একজন মানুষ। তার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।