সম্প্রতি অস্কারজয়ী ভারতীয় সুরকার ও সংগীতশিল্পী এ আর রহমানের একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে ভারতে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।
একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান দাবি করেন, বলিউডে 'সাম্প্রদায়িক' পক্ষপাতের কারণে তিনি হয়তো বেশ কিছু কাজ হারিয়েছেন। তার এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর তোপের মুখে পড়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা ও পাল্টা আক্রমণ।
বলিউডে কাজের পরিবেশ এবং শিল্পী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রহমান হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের এই বৈষম্যের বিষয়টি ইঙ্গিত করেন। তবে তার এই বক্তব্যকে ভালোভাবে নেয়নি কট্টরপন্থীরা। ফলে অনলাইনে ট্রল ও নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হচ্ছে ভারতীয় এই সুরকারকে।
অস্কার, গ্র্যামি থেকে শুরু করে গোল্ডেন গ্লোবের মতো বিশ্ব সংগীতের সব বড় পুরস্কারই রয়েছে এ আর রহমানের ঝুলিতে। তার সৃষ্টি 'জয় হো' গানটি এক সময় বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। ভারতের অন্যতম শীর্ষ বেসামরিক সম্মাননা 'পদ্মভূষণে' ভূষিত ৫৯ বছর বয়সী এই শিল্পীকে ভক্তরা ভালোবেসে ডাকেন 'মাদ্রাজের মোৎজার্ট' নামে।
সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ভারতের সম্মান বাড়ানো এ আর রহমানের সঙ্গে এমন আচরণ নিয়ে এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একদিকে যেমন অনেকেই তার সাহসিকতার প্রশংসা করছেন, আবার তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ বলছেন, তিনি 'ভিকটিম কার্ড' খেলছেন।
গত শুক্রবার বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে প্রচারিত ৯০ মিনিটের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান বলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, 'যাদের কোনো সৃজনশীলতা নেই, তাদের হাতেই এখন সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চলে গেছে। এটি হয়তো কোনো সাম্প্রদায়িক বিষয়ও হতে পারে, তবে আমার মুখের ওপর কেউ কিছু বলেনি।'
বলিউডে কাজ হারানোর অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমি মানুষের মুখে শুনতে পাই যে আমাকে কোনো কাজের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু পরে দেখা যায়, মিউজিক কোম্পানিগুলো অন্য পাঁচজন সুরকারকে ভাড়া করেছে। তখন আমি মনে মনে বলি, ভালোই হলো, এখন আমি পরিবারের সঙ্গে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটাতে পারব!'
ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'বিশ্ব হিন্দু পরিষদ' (ভিএইচপি)-এর বিনোদ বনসাল রহমানের এই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা দাবি করেছেন। তিনি বলেন, 'রহমান যা করেছেন তার জন্য আমরা গর্বিত। কিন্তু যে ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন, সেই দেশের বদনাম করাটা অত্যন্ত আপত্তিজনক।'
তবে রহমানের এই দুঃসময়ে বলিউডের খুব কম মানুষকেই তার পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। চলচ্চিত্র জগতের অধিকাংশ মানুষই এ বিষয়ে নীরবতা পালন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত একটি ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হন এই অস্কারজয়ী সুরকার। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক ভিডিওতে এ আর রহমান বলেন, 'আমি বুঝতে পারছি যে আমার উদ্দেশ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। তবে আমার লক্ষ্য সবসময়ই সংগীতের মাধ্যমে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এবং দেশের সেবা করা।'
তিনি আরও বলেন, ভারতের বিনোদন জগত এবং তরুণ সৃজনশীলদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। বর্তমানে তিনি হিন্দু মহাকাব্য অবলম্বনে তৈরি হতে যাওয়া 'রামায়ণ' সিনেমার সংগীত পরিচালনার কাজ করছেন, যেখানে তার সঙ্গে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত জার্মান সুরকার হ্যান্স জিমার।
'টু কিল আ ডেমোক্রেসি: ইন্ডিয়াস প্যাসেজ টু ডেসপটিজম' বইয়ের সহ-লেখক দেবাশিস রায় চৌধুরী বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাঁর মতে, এই অনলাইন ট্রলিং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল।
তিনি বলেন, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড শোরগোল তোলা হয়, তখন সেটি ধীরে ধীরে মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়। সাধারণ মানুষের কাছে তখন মনে হয়, এটাই বুঝি সমাজের মূল সুর।
রায় চৌধুরী আরও বলেন, 'তখন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের চিৎকারগুলো যুক্তি আর সহনশীলতাকে ডুবিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না এবং একেই সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে মিথ্যেভাবে দাবি করা হয়।'
এ আর রহমান সচরাচর রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন না, নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও তাকে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না।
তবে গত সপ্তাহে রহমানের করা মন্তব্য ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গনে, বিশেষ করে বলিউডে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বলিউডের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি এখন চাপের মুখে। অনেক সমালোচক মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বলিউড এখন এমন সব সিনেমা তৈরি করছে, যা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' (২০২২) বা 'দ্য কেরালা স্টোরি'র (২০২৩) মতো সিনেমাগুলো নিয়ে ভারতে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। এসব সিনেমার বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। এমনকি খোদ এ আর রহমানও এই স্রোত থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেননি।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া 'ছাবা' সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন রহমান। এই সিনেমায় মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে অত্যন্ত নৃশংস ও নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা চলছে। বিবিসির সাক্ষাৎকারে রহমান নিজেও স্বীকার করেছেন যে এই সিনেমাটি 'বিভাজনমূলক' ।
বিশ্লেষকদের মতে, বলিউডের ওপর এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার কারণেই এ আর রহমানের মতো গুণী শিল্পীরাও এখন কোণঠাসা বোধ করছেন। ভারতের এই সুরসম্রাটের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি তাই কেবল ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, বরং বলিউডের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণেরই এক বহিঃপ্রকাশ।
বলিউডের রূপালি পর্দায় এখন মুসলিমদের খলনায়ক বা নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরার এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র সমালোচক রাজা সেন বলেন, 'আমরা এখন পর্দার ওপর মুসলিমদের এক ধরনের চরিত্রহনন দেখতে পাচ্ছি।'
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আগে বলিউডে কেবল পাকিস্তান-বিদ্বেষী একটি বয়ান ছিল। কিন্তু এখন সেই চিত্রপট পুরোপুরি বদলে গেছে।'
দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি সিনেমায় পাকিস্তানকে প্রধান শত্রু হিসেবে দেখানো হতো। যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ বা গোয়েন্দাগিরি ছিল এসব সিনেমার মূল বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সমালোচকদের মতে, আগে যা ছিল বিদেশি শত্রু কেন্দ্রিক, এখন তা নিজ দেশের মুসলিমদেরই 'অভ্যন্তরীণ হুমকি' হিসেবে দেখানোর দিকে ঝুঁকছে।
বিতর্ক এড়াতে অনেক নির্মাতা এখন সিনেমার মূল চরিত্রের নামও বদলে দিচ্ছেন। রাজা সেন দাবি করেন, একজন বড় মাপের নির্মাতা তাঁর আগামী সিনেমার মুসলিম নায়কের নাম বদলে হিন্দু নাম রেখেছেন। তিনি বলেন, 'তারা হয়তো ভেবেছেন, কেন একজন নায়ক বা ইতিবাচক চরিত্রকে মুসলিম হিসেবে দেখানো হবে? এটি অনেকটা ৯/১১ পরবর্তী আমেরিকার হলিউডের মতো, যেখানে মুসলিম মানেই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হতো।'
হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মুসলিম অভিনেতা, পরিচালক ও কলাকুশলীদের অবদান অনস্বীকার্য। শাহরুখ খান, আমির খান, সালমান খান বা সাইফ আলী খানের মতো তারকাদের জনপ্রিয়তাকেই এক সময় বলিউডের অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলেছে। ভারতের এই শীর্ষ মুসলিম তারকারা এখন বারবার উগ্রপন্থীদের নিশানায় পরিণত হচ্ছেন। কেবল তাদের সিনেমা নয়, ব্যক্তিগত মতামত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেও তাঁদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
আমির খানের সিনেমাগুলো বারবার 'বয়কট' বা বর্জনের ডাকের মুখে পড়ছে। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া 'পিকে' সিনেমায় ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা করায় তিনি তোপের মুখে পড়েছিলেন। ২০২২ সালে 'লাল সিং চাড্ডা' মুক্তির সময়ও তাঁর পুরনো কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিরোধিতা করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আমির খানকে প্রকাশ্যে বলতে হয়, 'আমি সত্যিই আমার দেশকে ভালোবাসি।' এমনকি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও 'লাভ জিহাদ'-এর মতো বিতর্কিত অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, শাহরুখ খানকেও বারবার 'দেশবিরোধী' হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। ২০১৫ সালে অসহিষ্ণুতা নিয়ে কথা বলায় তাঁকে আক্রমণের শিকার হতে হয়। ২০২১ সালে মাদক মামলায় তাঁর ছেলে আরিয়ান খানকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু সেই সময় শাহরুখের দেশপ্রেম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ প্রচার চালানো হয়। এমনকি অতি সম্প্রতি কলকাতা নাইট রাইডার্সে (কেকেআর) বাংলাদেশি ক্রিকেটার নেওয়ায় এক নেতা তাকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলে কটাক্ষ করেন। ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক উত্তেজনার জেরে শেষ পর্যন্ত ওই খেলোয়াড়কে বাদ দিতে বাধ্য হয় কেকেআর।
এ আর রহমানের মতো বিশ্ববরেণ্য সংগীতশিল্পীর ওপর চলা সাম্প্রতিক এই আক্রমণ ভারতের শিল্পীদের মধ্যে এক ধরনের 'আতঙ্কের পরিবেশ' তৈরি করেছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে হিন্দি সিনেমায় সৃজনশীল স্বাধীনতা আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়েছে। কোনো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কাজ করার আগেই উগ্রপন্থীদের আক্রমণের ভয়ে অনেক নির্মাতা এখন পিছু হটছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বলিউডে টিকে থাকার জন্য 'নীরবতা' আর সেলফ সেন্সরশিপ এখন প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে।