পাকিস্তানি ড্রামা ‘দার-ই-নিজাত’-এর নায়ক আবু বকর এখন অনেক নারী দর্শকের ক্রাশ। কেউ লিখছেন ‘আবু বকরের মতো স্বামীই তো চাই!’ কেউবা বলছেন ‘জীবনসঙ্গী হলে হতে হবে আবু বকরের মতো।’ আবার কেউ মজার ছলে লিখছেন ‘বাস্তবে আবু বকর নামে কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে হয়তো অনেকেই তা গ্রহণ করতেন না। অথচ পর্দার আবু বকরের প্রেমে পড়তে তাঁদের আপত্তি নেই!’
বিষয়টি নিছক বিনোদন বা সাময়িক মুগ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর মধ্য দিয়ে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে প্রত্যাশা এবং ভালোবাসা নিয়ে ধারণার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ পায়। পর্দার কোনো চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে নিজের জীবনের আদর্শ সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করার প্রবণতা নতুন নয়। পাকিস্তানি ড্রামা ছাড়াও কোরিয়ান, তুর্কি কিংবা জাপানি সিরিজের বিভিন্ন চরিত্র নিয়েও দর্শকদের মধ্যে এমন মুগ্ধতা দেখা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো পর্দায় দেখা ভালোবাসার রূপ যখন বাস্তব সম্পর্কের মানদণ্ড হয়ে ওঠে তখন কী ঘটে? আমরা কি অজান্তেই নিজের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কাল্পনিক চরিত্রের তুলনা করতে শুরু করি? কিংবা বাস্তব সম্পর্কের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিতে না পেরে পর্দার মতো নিখুঁত ভালোবাসা প্রত্যাশা করি?
'তেরে বিন'দেখার সময় মুরতাসিম খানের মতো কাউকে চাইতাম..’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর আবু বকরকে নিয়ে আলোচনার ধরন লক্ষ করলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়। এই ড্রামার নায়ক আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করা শেহরিয়ার মুনাওয়ার অভিনয়কে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছেন আদর্শ স্বামীর প্রতিচ্ছবি। নারীভক্তরা তাঁর আচরণ নিয়েও কথা বলছেন। রাগের সময় নিজেকে সামলে রাখা, স্ত্রীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির সময় ধৈর্য ধরে কথা বলার মতো গুণগুলো তাঁকে অনেকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পাকিস্তানি ড্রামার নায়কদের জনপ্রিয় হওয়ার সূচনা আবু বকরকে দিয়ে হয়নি। যখন কোনো নাটকের নায়ক চরিত্রটি দর্শকের মনে দাগ কাটে, তখনই ঐ চরিত্রের মতো জীবনসঙ্গী চান এমন পোস্ট করেন অনেকে। যেমন পাকিস্তানি নাটক ‘হামসাফার’-এর আশর কিংবা ‘কাভি ম্যায় কাভি তুম’-এর মুস্তাফার মতো চরিত্র নিয়েও দর্শকেরা সম্পর্কের আচরণ, আবেগ ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’-এর কাশফ ও জারুনের সম্পর্কও দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিরিজের ‘এক চায়ে কা কাপ থা’ দর্শকরা বেশ আগ্রহ করে ফেসবুকে শেয়ার করে থাকেন। এখানেও দেখানো হয়েছে একজন আদর্শ পুরুষ কীভাবে তাঁর প্রিয়জনের দুঃখ-কষ্টে ভরা জীবনকে বদলে দিতে পারেন।
পাকিস্তানি রোমান্টিক ধারাবাহিক ‘তেরে বিন’ ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর জিও টিভিতে প্রচার শুরু হয়। এতে নায়ক মুরতাসিম চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওয়াহাজ আলী এবং নায়িকা মীরাবের ভূমিকায় ইয়ুমনা জায়েদি। প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও দুই বিপরীত স্বভাবের মানুষের সম্পর্কের গল্পটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এদিকে এই ড্রামার নায়ক মুরতাসিম আবু বকর কিংবা জারুনের মতো শান্ত বা নরম স্বভাবের নয়। সে রাগী, জেদি এবং নিজের কথায় অটল। অথচ এটি মুক্তির সময়ও অনেক মেয়ের কাছে পছন্দের চরিত্র ছিল এটি। কারণ, তার রাগী স্বভাবের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস আছে, দায়িত্ব নিতে জানে এবং ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখতে চায়। তবে নাটকে যে আচরণকে রোমান্টিক মনে হয়, বাস্তব সম্পর্কে তা সব সময় ভালো বা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
একজন দর্শক পোস্ট দিয়েছেন,
'তেরে বিন'দেখার সময় মুরতাসিম খানের মতো কাউকে চাইতাম
'মিমসে মোহাব্বত' দেখার সময় স্যার তালহাকে
'দার-ই-নিজাতের' সময় আবু বকরকে
আর সবকিছুর পর বাস্তবে আমার দেখা হয় 'তুমি যেমনটা ভাবতেছো আমি ওমন না বা তোমার কাছে আমি সারাজীবনই খারাপ থাকবো আর নয়তো হামারি আম্মি নেহি মানেগি টাইপ ব্যাডার সাথে'
কেন দর্শকরা এ ধরনের চরিত্র পছন্দ করছেন
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আদিবা রহমান পাকিস্তানি ড্রামা দেখতে পছন্দ করেন। নাটকের দৈর্ঘ্য কম হওয়ায় সহজেই এক বসায় দেখে ফেলতে পারেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানি ড্রামাগুলোর পর্বসংখ্যাও বেশি হয় না, তাই সহজেই শেষ করা যায়। কেন পাকিস্তানি ড্রামার নায়কদের ভাল লাগে জানতে চাইলে আদিবা রহমান বলেন, পাকিস্তানি নাটক দেখতে ভালো লাগে কারণ হিন্দি বুঝতে পারি বলে উর্দুও অনেকটা বোঝা যায়।
এ ছাড়া নাটকগুলো ইউটিউবে এভেইলেবল থাকায় দেখতে ঝক্কি পোহাতে হয় না। আর নাটকের কাহিনীর সঙ্গে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির মিল আছে। এই নাটকের পুরুষ চরিত্রগুলো তার সঙ্গীর ব্যাপারে খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করে। তারা মুখে ভালবাসি বলার চেয়ে কাজে প্রমাণ দেখায়। এটাও সবচেয়ে ভাল লাগে।
এ দিকে দুই সন্তানের জননী রাইসা আমিনও ঘরের কাজ শেষ করে ইউটিউবে পাকিস্তানি ড্রামা দেখেন। তাঁর প্রিয় ড্রামার মধ্যে আছে এহদ-ই-ওয়াফা, ইয়াকিন কা সাফার, মুঝে পিয়ার হুয়া থা। আর এখন পছন্দের শীর্ষে আছে দার-ই-নিজাত। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানি ড্রামার কাহিনিগুলো খুবই দ্রুত পরিবর্তন হয়। মানে পরিবারে ঝগড়া হয়েছে মানে কয়েকটা পর্ব এই ঝগড়ার ওপর ভিত্তি করে হবে এমন না। আর এখানে প্রেমের কাহিনিগুলোও খুব মার্জিত ভঙ্গিতে দেখানো হয়। দার-ই-নিজাতে সেরকমভাবে রোমান্টিক দৃশ্য নেই অথচ ধর্মীয় মূল্যবোধ, দায়িত্ব আর স্ত্রী-র জন্য ভালবাসা পুরো গল্পটিকেই রোমান্টিক করে তুলেছে।’
নাটকের প্রেম কীভাবে মনের ভেতর তৈরি করে আদর্শের ছবি
শুধু পাকিস্তানি ড্রামা নয়, কোরিয়ান ড্রামার প্রতিও ভক্তদের মুগ্ধতা আলাদা রকমের। ২০২৫ সালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ১৬ পর্বের কোরিয়ান ড্রামা ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস’। এই ড্রামানিয়ে এখনও সামাজিক মাধ্যমে অনেক পোস্ট ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
পর্দার নায়ক বা চরিত্রের সঙ্গে বাস্তব জীবনের মানুষের তুলনা করে অনেকেই নিজের জীবনে ঠিক তেমন একজন পার্টনার প্রত্যাশা করেন। এটি কেবল ফেসবুক পোস্ট হলেও এধরনের লেখা অনেকের চিন্তাভাবনা ও সম্পর্কের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাছাড়া নাটক বা সিরিয়ালের চরিত্রগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন সেগুলো দর্শকের পছন্দ, আবেগ ও অনুভূতিকে সহজেই স্পর্শ করতে পারে। তাই পর্দায় আমরা চরিত্রগুলোর সুন্দর আচরণ, যত্ন, ভালোবাসা ও রোমান্টিক মুহূর্তগুলো বেশি দেখতে পাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা কেউই নিখুঁত নই। প্রত্যেক মানুষেরই কিছু সীমাবদ্ধতা, ভুল ও দুর্বলতা রয়েছে।
মজার বিষয় হলো, পর্দায় যে ছোট ছোট যত্ন, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো আমাদের কাছে এত বিশেষ মনে হয়, সেগুলোর অনেক কিছুই হয়তো আমাদের বাস্তব জীবনেও ঘটে। কিন্তু আমরা এই বিষয়গুলোর প্রতি ততটা মনোযোগ দিই না। কারণ পর্দায় ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, দৃশ্যের উপস্থাপন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং সংলাপের মাধ্যমে একটি সাধারণ ঘটনাকেও অসাধারণ ও আবেগঘন করে তোলা হয়। অথচ বাস্তব জীবনে সেই একই ধরনের যত্ন বা ভালোবাসা অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানের প্যারাসোশাল রিলেশনশিপ বা একতরফা আবেগগত সম্পর্ককে এর সঙ্গে মেলানো যায়। দর্শক কোনো চরিত্রকে নিয়মিত দেখতে দেখতে তাঁর সঙ্গে পরিচিতির অনুভূতি তৈরি করতে পারেন। বাস্তবে চরিত্রটি দর্শককে চেনে না, কিন্তু দর্শকের মনে সে পরিচিত একজনের মতো জায়গা করে নেয়। তবে কোনো চরিত্রের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে তার আচরণ দর্শকের কাছে আদর্শ বলে মনে হতে পারে।
২০১৫ সালে ম্যারেজ এন্ড ফ্যামিলি রিভিউ সাময়িকীতে প্রকাশিত লরেন গ্যালোওয়ে, এরিকা এংস্ট্রম ও তারা এমার্স-সোমারের গবেষণায় তরুণদের রোমান্টিক চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাস এবং প্রেম নিয়ে তাঁদের বিশ্বাসের সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, রোমান্টিক কমেডি ও নাটক পছন্দ করার সঙ্গে ‘ভালোবাসা সব বাধা জয় করে’ এমন আদর্শবাদী বিশ্বাস এবং বেশি প্রত্যাশার সম্পর্ক রয়েছে।
মনোবিদ যা বলছেন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শ দান কেন্দ্রের উপ-পরিচালক মনোবিদ শুভাশীষ কুমার চ্যাটার্জী বলেন, কোরিয়ান সিরিয়াল বা পাকিস্তানি ড্রামা দেখে অনেক মানুষই বাস্তব জীবনে তাদের পার্টনারকে নাটক বা সিরিয়ালের চরিত্রগুলোর মতো করে পেতে চান। সমাজ-মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গণমাধ্যম মানুষের সামাজিক শিক্ষণ ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার সোশ্যাল লার্নিং থিওরি অনুযায়ী, মানুষ অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে, তা থেকে শেখে এবং পরে বাস্তব জীবনে সেই আচরণ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, অন্তরঙ্গতা এবং আবেগীয় সমর্থনের স্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে। যাদের বাস্তব জীবনে এসব চাহিদার ঘাটতি থাকে, তারা অনেক সময় নাটক বা সিরিয়ালের কোনো আদর্শ সম্পর্ককে নিজের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন এবং সেটিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘আইডিয়ালাইজেশন’ বলা হয়।
এ ক্ষেত্রে দর্শকরা নাটকের কোনো চরিত্রের বিশেষ কিছু ইতিবাচক গুণ বা আচরণ পছন্দ করেন এবং নিজের মধ্যে সেই গুণগুলো তৈরি করতে চান। একই সঙ্গে তারা বাস্তব জীবনেও সেই চরিত্রের মতো একজন পার্টনার পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, নাটক বা সিরিয়ালে সাধারণত চরিত্রগুলোর ইতিবাচক দিকগুলো বেশি তুলে ধরা হয়; তাদের বাস্তব জীবনের সীমাবদ্ধতা, ভুল, দুর্বলতা এবং সম্পর্কের জটিলতাগুলো অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
ফলে মানুষ যখন নাটকের কাল্পনিক সম্পর্কের সঙ্গে নিজের বাস্তব সম্পর্কের তুলনা করতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে কগনিটিভ ডিস্টরশন বা চিন্তাগত বিকৃতি এবং মেন্টাল ফিল্টারিং তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, সে নিজের পার্টনারের ইতিবাচক দিকগুলো উপেক্ষা করে নাটকের চরিত্রের সঙ্গে তাঁর অমিলগুলো বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
এ ক্ষেত্রে শুভাশীষ কুমার চ্যাটার্জির পরামর্শ, পর্দার সম্পর্ক অনেকটাই পরিকল্পিত ও কল্পনানির্ভর, আর বাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া, বিশ্বাস ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তাই পর্দার নায়ককে জীবনসঙ্গীর আদর্শ হিসেবে দেখার সময় পার্থক্য করা জরুরি। একজন সঙ্গী সব সময় প্রিয়জনের মনের কথা বুঝবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তিনি মন দিয়ে শুনবেন, ভুল হলে দায় নেবেন, মতের অমিলেও সম্মান বজায় রাখবেন এবং সম্পর্কের দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন এগুলো বাস্তব জীবনে চাওয়া যায়। তবে কখনো তাঁর আচরনে কষ্ট পাবেন না, ঝগড়া হবে না কিংবা আশাভঙ্গ হবে না; বাস্তবজীবন সাধারণত এতটা ‘গোছানো’ হয় না।
