Image description

তিনি আর দশটা তারকার চেয়ে আলাদা। ছবির প্রচারে সেভাবে পাওয়া যায় না, সাক্ষাৎকার দেন না বললেই চলে। পর্দার বাইরে তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। এই সময়ে এসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগ দিয়েছেন মাত্র বছর কয়েক আগে। সেখানেও তাঁর উপস্থিতি সক্রিয় নয়। এমনকি সিনেমার স্টিলের বাইরে তাঁর ছবিও পাওয়া যায় না। সেই বিজয় যখন রাজনীতিতে যোগ দিলেন, অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। রাজনীতি মানেই তো যোগাযোগ, বক্তৃতা, সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া। নিজেকে একরকম খোলসবন্দী করে রাখা বিজয় কি সেটা পারবেন? তিনি যে পেরেছেন, সেটা নিশ্চয় এতক্ষণে জানা হয়ে গেছে আপনার। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বিজয় এখন রাজ্যটির মূখ্যমন্ত্রী। আজ ২২ জুন এই অভিনেতা ও রাজনীতিবিদের জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

সিনেমার পরিবেশে বড় হওয়া
বিজয় জন্ম থেকেই সিনেমার পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন জনপ্রিয় তামিল নির্মাতা। বাবার পরিচালিত ১৯৮৪ সালের ছবি ‘ভেটরি’তে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় বিজয়ের।
এক সাক্ষাৎকারে এস এ চন্দ্রশেখর জানিয়েছিলেন, সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিজয়কে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫০০ রুপি। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, একদিন এই শিশুশিল্পীই দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন।

চন্দ্রশেখর আরও দাবি করেন, বহু আগেই তাঁর ছেলে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি একদিন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হব।’

৫০০ টাকা থেকে ২২০ কোটি
বর্তমানে বিজয়ের পারিশ্রমিক নিয়ে পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতেই আলোচনা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তাঁর শেষ ছবি হিসেবে প্রচারিত ‘জন নায়গন’-এর জন্য তিনি প্রায় ২২০ কোটি রুপি নিয়েছেন।
অর্থাৎ ৫০০ টাকা থেকে ২২০ কোটি—পারিশ্রমিকের এই বৃদ্ধি প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ শতাংশের বেশি। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন উত্থান খুব কম অভিনেতার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।

বিজয়ের শেষ সিনেমা ‘জন নায়গন’ এখন মুক্তির অপেক্ষায়। এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি যেন রাজনৈতিক ঘোষণা। ছবিতে আছে জাঁকজমকপূর্ণ অ্যাকশন, ভিএফএক্স আর সংলাপ—‘রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।’ এই সংলাপ যেন সরাসরি বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। মুক্তির আগে অবশ্য সিনেমাটি বারবার পিছিয়েছে। ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড আপত্তি জানিয়েছে, নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এমনকি মুক্তির আগে সিনেমাটির এইচডি প্রিন্টও ফাঁস হয়েছে অনলাইনে। তবু ভক্তের উৎসাহের কমতি নেই।

ক্যারিয়ারের বড় বাঁকবদল
১৯৯০-এর দশকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়লেও বিজয়ের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০৪ সালের ব্লকবাস্টার ‘ঘিল্লি’। ছবিটি তাঁকে সাধারণ দর্শকের কাছে ‘মাস হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ২০১২-এর পর থেকে পর্দায় তাঁকে দেখা গেছে সমাজ বদলের নায়ক হিসেবেই। এই সময়ে ‘কাথি’-তে কৃষকের দুর্দশা, ‘মার্সাল’-এ স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, ‘বিগিল’-এ খেলাধুলায় নারীদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। এসব বিষয় তুলে ধরে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক বার্তার নায়ক হয়ে ওঠেন।

দক্ষিণের বড় তারকা
ভারতের অন্য তারকারা যখন প্যান-ইন্ডিয়া ছবির দিকে ঝুঁকেছেন, বিজয় তখনো মূলত তামিল ছবিতেই অভিনয় করে গেছেন। তবু তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি একটুও। ‘লিও’ বিশ্বজুড়ে ৬০০ কোটির বেশি আয় করেছিল। এরপর ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ও বিশ্বব্যাপী ৪০০ কোটির বেশি ব্যবসা করে। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, বিজয়ের দর্শক টানার ক্ষমতা কতটা বিশাল।

ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়)। শপথ নেওয়ার পর অভিষেক ভাষণে
ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়)। শপথ নেওয়ার পর অভিষেক ভাষণেছবি: এএফপি

সিনেমা ছেড়ে রাজনীতিতে
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় রাজনীতিতে নামার অনেক আগেই তাঁর সিনেমা সেই প্রস্তুতি তৈরি করে দিয়েছে। তাঁর ছবির অডিও প্রকাশের অনুষ্ঠান হয়ে উঠত ‘সফট রাজনৈতিক ভাষণ’। ভক্তকুল, যারা আগে শুধু সিনেমা উদ্‌যাপন করত, ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে। ২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তাঁর সমালোচনা এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।

ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। এ কথাগুলো নতুন ভোটার ও শহরের স্বপ্নবান তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।

কেন সিনেমা ছাড়লেন বিজয়
বিজয়ের যুক্তি স্পষ্ট—রাজনীতি আংশিকভাবে করা যায় না। জনগণ পূর্ণ সময়ের নেতা চায়। তামিল রাজনীতির ইতিহাসও সেটাই বলে। এমজিআর ও জয়ললিতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অভিনয় ছেড়েছিলেন। বিপরীতে কমল হাসানের মতো যাঁরা একসঙ্গে সিনেমা ও রাজনীতি করেছেন, তাঁদের সাফল্য সীমিত। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই বিজয়ের সিদ্ধান্ত—পুরোদমে রাজনীতি। মালয়েশিয়ায় এইচ বিনোথের ‘জন নায়গন’ ছবির গান মুক্তির অনুষ্ঠানে এই অবসরের ঘোষণা দেন বিজয়। তাই ‘জন নায়গন’ অভিনেতার শেষ ছবি হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মঞ্চে গানের তালে কোমরও দোলান তিনি। সেদিন নীরবতা ভেঙে অনেক কথাই বলেন তিনি। অভিনয়জীবন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিজয় জানান, ৩৩ বছর ধরে তিনি সমালোচনার শিকার। নানা সমালোচকের আক্রমণ সামলেছেন, তিনি ‘নেতিবাচক-ইতিবাচক—সব ধরনের সমালোচনার তির বিঁধেছে আমাকে। পাশাপাশি ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। তাঁদের মুখ চেয়েই আমি এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম।’ অভিনেতা-রাজনীতিবিদের কথায়, ‘অনুরাগীরা ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। তাই আগামী ৩৩ বছর তাঁদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি রাজনীতিবিদ হিসেবে বাকি জীবন কাটাতে চাইছি। আমাকে ভক্তদের ঋণ শোধ করতে হবে।’

থালাপতি বিজয়
থালাপতি বিজয়ইনস্টাগ্রাম থেকে

কী আছে শেষ সিনেমায়
বিজয়ের শেষ সিনেমা ‘জন নায়গন’ এখন মুক্তির অপেক্ষায়। এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি যেন রাজনৈতিক ঘোষণা। ছবিতে আছে জাঁকজমকপূর্ণ অ্যাকশন, ভিএফএক্স আর সংলাপ—‘রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।’ এই সংলাপ যেন সরাসরি বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। মুক্তির আগে অবশ্য সিনেমাটি বারবার পিছিয়েছে। ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড আপত্তি জানিয়েছে, নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এমনকি মুক্তির আগে সিনেমাটির এইচডি প্রিন্টও ফাঁস হয়েছে অনলাইনে। তবু ভক্তের উৎসাহের কমতি নেই।

কত সম্পদের মালিক
নির্বাচনের আগে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, বিজয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০৩ কোটি রুপি। বিজয়ের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মধ্যে বড় অংশই অস্থাবর—প্রায় ৪০৪ কোটি ৫৮ লাখ রুপি। বাকি ১৯৮ কোটি রুপি স্থাবর সম্পদ। তাঁর সম্পদের তালিকায় রয়েছে কোদাইকানালে কৃষিজমি আর চেন্নাইসহ বিভিন্ন জায়গায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক সম্পত্তি। নগদ অর্থ হিসেবে হাতে রয়েছে প্রায় দুই লাখ রুপি। পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে জমা রয়েছে ২১৩ কোটির বেশি। সোনা-রুপার অলংকারও আছে—মোট ৮৮৩ গ্রাম, যার মূল্য প্রায় ১৫ লাখ রুপি।

বিলাসবহুল গাড়ির তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিএমডব্লিউ, টয়োটার কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিজয়ের মোট আয় ছিল ১৮৪ দশমিক ৫৩ কোটি রুপি। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে স্বনিযুক্ত কাজ, সুদের আয় এবং সম্পত্তি থেকে ভাড়া।

আলোচনায় ব্যক্তিগত জীবন
নির্বাচনের আগে বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবন আলোচনায় আসে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে বিচ্ছেদের আবেদন করেন তাঁর স্ত্রী সংগীতা স্বর্ণলিঙ্গম। তিনি নাম প্রকাশ না করলেও আঙুল ওঠে অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণানের দিকে। যদিও বিজয় বা তৃষা কেউই এ বিষয়ে কিছু বলেননি।
১৯৯৯ সালে বিয়ে করেছিলেন বিজয় ও সংগীতা। দীর্ঘ ২৭ বছরের সংসারজীবনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচ্ছেদের আবেদন করেন সংগীতা।

আবেদনে সংগীতা অভিযোগ করেন, বিজয় একজন নারী অভিনেত্রীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ২০২১ সালে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন এবং স্বামীকে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বিজয় সম্পর্কটি শেষ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

কিন্তু পরে সংগীতা দেখতে পান, সেই সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট অভিনেত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সফরেও অংশ নিয়েছেন বিজয়। বিচ্ছেদ মামলাটি প্রথমে গত ২০ এপ্রিল শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত ছিল। তবে সেদিন বিজয় ও সংগীতা—কেউই আদালতে হাজির না হওয়ায় পরিবার আদালত তাঁদের ১৫ জুন উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। সেদিন মামলার শুনানি শুরু হলেও আদালত তা নিষ্পত্তি না করে আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেন।

ফলে বহুল আলোচিত এ মামলার আইনি প্রক্রিয়া আরও অন্তত দুই মাস চলবে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে ও আইএমডিবি অবলম্বনে