‘আমাদের সমাজে লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের আলাদা করে চেনার মতো অবস্থান নেই। কারণ তারা গণসেন্টিমেন্টের সঙ্গে তাল দিয়ে জনপ্রিয় হওয়ার নেশায় জনগণেরেই অংশ হয়ে গেছেন। অথচ কথা ছিল অন্ধকারে মশাল হাতে তারা দাঁড়িয়ে থাকবেন, প্রয়োজনে একা’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শনিবার কথাগুলো লিখেছেন কথাসাহিত্যিক মোজাফফর হোসেন।
তার পোস্টের কমেন্টে আরেক কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান লিখেছেন, ‘আমাদের অধিকাংশ লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী কেবল প্রশংসা চায়। গালি, নিন্দা ও সমালোচনা হজমের ক্ষমতা তাদের কম। নিরুপদ্রব জীবনই তাদের লক্ষ্য। কোনো রিস্ক নিতে রাজি না।’
কেন শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা রিস্ক নিতে রাজি নন? একের পর এক যখন শিল্পীদের উপরই আঘাত আসছে, তখনও তারা কেন এমন নিরুপদ্রব? পঞ্চাশ-ষাট কিংবা আশি-নব্বই দশকেও যে প্রতিবাদী বৈশিষ্ট্য ছিল শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের, তা এখন দেখা যায় না। তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাধার মুখে স্থগিত হওয়ার ঘটনায় শিল্পী-সংস্কৃতিমর্মীদের নিরবতার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই ফেসবুকে প্রশ্ন হাজির করেছেন।
কয়েকটি কারণে শিল্পীদের এই নিরবতা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় শিল্প-সংস্কৃতির উপর আঘাত এলেও শিল্পীরা জোরালো প্রতিবাদ করতে পারছেন না। এর মধ্যে একটা অন্যতম কারণ হল— শিল্পীরা তাদের আদর্শিক জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়ানোর আগ্রহ শিল্পীস্বত্ত্বাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।’
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি অংশের বাধার মুধে সাময়িক স্থগিত হয়েছে। শনিবার বিকালে শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সিনেমাটির প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সিনেমাটির নির্মাতা তানিম নূর বলেছেন, ‘যে দেশের প্রধানমন্ত্রী তার কন্যাকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন, আর সে দেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ সিনেমা দেখতে পারবে না? মামা-বাড়ির আবদার নাকি? বাংলাদেশে সিনেমার প্রদর্শনী নিষিদ্ধ নয়। সেন্সর পাওয়া একটা সিনেমা কেউ অশ্লীল ট্যাগ দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে না। খুব দ্রুতই আরো বড়ো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী হোক ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। আর যে বা যারা মব তৈরির থ্রেট দিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি এখন। এটা না করলে অন্য জেলাগুলোর জন্য এই (অ)ঘটনা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে। প্রশাসন মাথা নত করলে আমরা শেষ, বাংলাদেশ শেষ।’
আয়োজকেরা বলছেন, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে আয়োজনের ভেন্যু কর্তৃপক্ষ অনুমতি প্রত্যাহার করায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ভেন্যু-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত শুক্রবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামল এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর প্রোগ্রামটি পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অতি শিগগিরই পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচিত সরকারেও অন্তর্বর্তী ছায়া
শিল্পচর্চাটাই শিল্পীর রাজনীতি উল্লেখ করে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিগত সময়েও ক্ষমতাসীনদের দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়েছেন অনেক শিল্পী, এখনো এই ধারা অব্যহত আছে। এটা কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারতেও হচ্ছে। শিল্পীরা কোনো আদর্শিক জায়গা থেকে যে দলীয় রাজনীতিতে জড়াচ্ছে, তা নয়। বরং তারা এটা করছে ক্ষমতার কাছে থাকার আগ্রহ থেকে। এতে করে ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে শিল্পীরাও কথা বলবার শক্তি হারিয়েছেন।’
চব্বিশের অভ্যুথানের পর দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চর্চা বেড়েছে বলেও মনে করেন জোবাইদা নাসরীন। তিনি বলছেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেক জায়গায় শিল্পীদের মামলা দিয়ে জেলে নেওয়া হয়েছে। বাউলদের ওপর হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও তাদের মাঝে ইউনূস সরকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। শিল্পীদের নিরাপত্তা, নিরাপদে শিল্পচর্চার পরিবেশ দিতে এই সরকারও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।’
সস্তা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি
বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী চাপের মুখে স্থগিত হওয়ার পর কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, "সমস্যাটি 'বনলতা এক্সপ্রেস' ছবি নিয়ে নয়। এই ছবি ভালো কি মন্দ, জায়েজ কি নাজায়েজ, সেটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, তারা যেকোনো সিনেমা দেখানোর বিরুদ্ধে। কেন? তারা মনে করে, সিনেমা দেখা ও দেখানো গুনাহের কাজ। গুনাহ প্রতিরোধ করা সওয়াবের কাজ।"
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এ ধরনের ঘটনা নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘অনেক বছর আগে এরা নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এ শহরের এক হুজুরের অনুগতরা ব্র্যাক, প্রশিকা আর গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত নারী সংগঠনের সদস্যদের রাস্তার পাশে লাগানো গাছপালা উপড়ে ফেলেছিল। এনজিওবিরোধী লবি তখন এ নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছিল। কয়েক বছর আগে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রতিবাদে এখানে তুমুল বিক্ষোভ হয়। তৌহিদি জনতা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত একটি গানের স্কুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন-সহ অনেক স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়। তারা শহরে সিনেমা দেখা বন্ধ করে দেয়। এ শহরের সিনেমা হলগুলো এখন আর নেই।’
এরা কী চায়? এটা বুঝতে হলে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিনামা পড়ার পরামর্শ দিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সস্তা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি আর জামায়াতের নীতি এ ব্যাপারে এক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় এমপি ‘ভোট হারানোর ভয়ে’ এ নিয়ে কিছু বলবে না। ঢাকায় বসে কিছু বিবৃতিবাজ বিবৃতি দেবে। এ পর্যন্তই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিছু লোকজন যেসব অভিযোগ তুলে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে তা শুধু পুরোপুরি ভুল নয়, তা বিদ্বেষমূলক এবং অসুস্থ মানসিকতার লক্ষণ বলে মনে করেন ‘সর্বজন কথার’ সম্পাদক আনু মুহাম্মদ।
তিনি এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চা আরও বাড়াতে হবে। সারাদেশের বিভিন্ন শহরের মত এখানেও খাবারের দোকান, শপিং মল, বহুতল ভবনের সংখ্যা- চাকচিক্য বেড়েছে কিন্তু পাঠাগার বাড়ে নাই; চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, থিয়েটার, গান নাচ চর্চার উপরে বাধার পর বাধা। কয়েকবছর আগে এই শহরেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মারক ভবনের উপর হামলা হয়েছে। এসব কাজে লিপ্ত কান্ডজ্ঞানহীন অবোধ সন্ত্রাসী মানুষদের কথায় তো দেশ চলতে পারে না। ধর্মের নাম ব্যবহার করে তারা যে মাস্তানি করছে তাকে ধর্মের অবমাননা হিসাবে আখ্যায়িত করা সম্ভব।’
‘অবিলম্বে বৃহৎ আকারে এই শহরে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দেখাতে হবে। যারা এর প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে তাদেরও এই চলচ্চিত্র দেখে তারপর তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে হবে। শুধু তাই নয় এই শহরে চলচ্চিত্র উৎসব, থিয়েটার উৎসব, গানের মেলা ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করতে হবে। শিল্পকলা একাডেমির এতে নেতৃত্ব দেয়াই কাজ। প্রশাসনের দায়িত্ব তাকে সমর্থন দেয়া, বাধা দেয়া নয়’— বলছিলেন আনু মুহাম্মদ।
ক্ষতিটা কার?
এই ঘটনায় মুক্তি সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশ্বাসী এবং বর্তমান সরকারের ক্ষতি হলো বলে মনে করেন নির্মাতা আশফাক নিপুন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় 'বনলতা এক্সপ্রেস' চলচ্চিত্রের প্রদর্শন জেলার কওমা ছাত্র ঐক্য পরিষদ নামের কতিপয় ফ্রিঞ্জ এলিমেন্টের কারণে বন্ধ হওয়ায় 'বনলতা এক্সপ্রেস' টিমের বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতি নাই। এই ছবি দেশে–বিদেশে যত মানুষ দেখছে, ভালোবাসছে, ব্যবসা করছে, তাতে কোনো এক জেলায় না দেখালেও মোটা দাগে কোনো লস নাই তাদের। ক্ষতিটা কাদের? অবশ্যই যারা মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশ্বাস করেন, তাদের এবং অতি অবশ্যই বর্তমান সরকারের। জনগণের ভোটে নির্বাচিত যে সরকার তাদের প্রধানমন্ত্রীর কন্যাসমেত ঢাকায় সিনেপ্লেক্সে ছবি দেখতে যাওয়াকে ব্যাপকভাবে সেলিব্রেট করেন, সেই সরকারের প্রথম ১২০ দিনের মধ্যেই দেশে–বিদেশে দারুণভাবে সমাদৃত ১০০ ভাগ খাঁটি দেশীয় ছবির স্থানীয় প্রদর্শন বন্ধ হওয়া পুরাপুরি বিপরীতমুখী বার্তা দেয়। ইংরেজিতে যাকে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বলে।’
আরেক নির্মাতা রেদওয়ান রনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শুধু বনলতা এক্সপ্রেস নয়, দেশের সকল চলচ্চিত্রের জন্য এই ঘটনা চরম উদ্বেগজনক! আজ এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে অদূর ভবিষ্যতেই এটা চলচ্চিত্র উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এব্যপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেস প্রদর্শনী ঘিরে যা ঘটছে, তা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে জানিয়ে নির্মাতা খন্দকার সুমন বলছেন, ‘একটি চলচ্চিত্র পছন্দ না হতে পারে। একটি চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হতে পারে। কঠোর সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শন হতে দেওয়া হবে কি হবে না, সেই সিদ্ধান্ত কি কোনো চাপের মুখে নেওয়া হবে, নাকি আইন ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে নেওয়া হবে?’
এই ঘটনার মধ্যে কেবল একটি চলচ্চিত্রের সংকট নয়, বরং শিল্পচর্চার সংকট, সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকট এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট দেখছেন এই নির্মাতা। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমোদিত একটি চলচ্চিত্র যদি প্রদর্শনের আগেই বিভিন্ন চাপ, হুমকি বা সংগঠিত বিরোধিতার মুখে থামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আগামীকাল অন্য কোনো চলচ্চিত্র, নাটক, বই, চিত্রপ্রদর্শনী কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।’
তাঁর ভাষ্য, ‘একটি সভ্য সমাজে কোনো শিল্পকর্মের জবাব শিল্প, যুক্তি, সমালোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞা, ভয় প্রদর্শন বা প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়ে নয়। আমি বিশ্বাস করি, কোনো নাগরিকেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। রাষ্ট্রের আইন, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো সবার দায়িত্ব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। সেই ঐতিহ্যকে সংকুচিত নয়, আরও সমৃদ্ধ ও উন্মুক্ত দেখতে চাই।’