Image description

ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্যে একসময় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল দেশ। সরকারের অব্যাহত নীতিসহায়তা পাওয়ায় এরই মধ্যে এই খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ নিয়ে স্যামসাং, এলজির মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে মাঠে নেমেছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। ইলেকট্রনিকস শিল্পে করছাড় দেওয়ার কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যগুলো এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে।

বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। হাই-টেক খাতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক ইকো-সিস্টেম। সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছেছে ফ্রিজ, এসি। বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হয়েছে।
 
এর ফলে একসময়ের পুরোপুরি আমদানিনির্ভর খাতটি সম্পূর্ণ উৎপাদননির্ভর ও রপ্তানিমুখী হয়ে উঠেছে। মেড ইন বাংলাদেশ ট্যাগ লাগানো এসি, ফ্রিজ, টিভি, হোম অ্যাপ্লায়েন্স এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ৬৫ দেশে।

ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল ডিভাইস পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন হঠাৎ করে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর উদ্যোগে এই শিল্প হোঁচট খাবে।

এসব শিল্প ২০২১ সাল থেকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২ শতাংশ এআইটি এবং আয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর দেওয়ার সুবিধা পেয়ে আসছিল, যা ২০৩২ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা ছিল। সেই আদেশে বাতিল করে এখন এসব শিল্পে করপোরেট কর বা আয়কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। একে গাছে উঠিয়ে টান দিয়ে মই সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, যে হারে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে, তাতে পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাবে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, অন্যদিকে ক্রমাগত ট্যাক্স বাড়ানোর কারণে পণ্যমূল্য বাড়ছে।

ফলে ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রিও অব্যাহতভাবে কমছে। নতুন করে ট্যাক্স বাড়ালে তা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বাজার আরো সংকুচিত হবে। ঝুঁকিতে পড়েবে এই খাতের বিশাল বিনিয়োগ ও বিপুল কর্মসংস্থান।

তবে কর অব্যাহতি কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়ে ডিসেম্বরে অর্থ উপদেষ্টা বলেছিলেন, করছাড়ের মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়ার দিন এখন আর নেই। আমরা ৫০ বছর ধরে বহু শিশুকে করছাড় ও প্রণোদনা দিয়ে লালন করেছি। আর কতকাল শিশুকে লালন করব? যে শিশুকে এত দিন লালন-পালন করা হয়েছে, তারা এখন শারীরিকভাবে বড় হয়ে গেছে। তারা এখনো বলে, আমাদের সুরক্ষা দিন; কিন্তু সুরক্ষার দিন তো চলে গেছে।

কর বাড়ালে দেশের মোটরসাইকেল, রেফ্রিজারেটর ও এসি শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে এবং শেষ পর্যন্ত এই ভার ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে বলে জানিয়েছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা। 

দেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির শীর্ষ কম্পানি ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এস এম শোয়েব হোসেন নোবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুদহার দ্বিগুণ, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই শিল্প টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে। কারণ ফ্রিজ, এসির কাঁচামাল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। একমাত্র সরকারের নীতি-সহায়তার ওপর ভর করেই দেশে ইলেকট্রনিকস শিল্প গড়ে উঠেছিল। এখন আইএমএফের পরামর্শে ঢালাওভাবে শিল্পে করের বোঝা চাপিয়ে দিলে দেশের সব শিল্প পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আবারও দেশ আগের মতো আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।

ওয়ালটনের এএমডি আরো বলেন, আগে বাজার ছিল আমদানিনির্ভর। ৯৭ শতাংশ পণ্য এখন দেশেই তৈরি হয়। বাকি ৩ শতাংশ পণ্য আমদানি করা হয়। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে সুবিধা করতে না পারলে আবারও ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে ঝুঁকবে। ইলেকট্রনিকস পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে দুই লাখ মানুষ জড়িত। পরোক্ষভাবে সাত-আট লাখ মানুষ জড়িত। এই খাতে ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এখনকার যে সংকটগুলো রয়েছে তাতে এই খাতে পণ্য উৎপাদন করা ব্যবসায়ীদের জন্য কস্ট ইফেক্টিভ হচ্ছে না। পণ্য রপ্তানি করে এই ঘাটতি পূরণ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে এখন যেভাবে সব চলছে তাতে স্থানীয় বাজারে টিকে থাকাই কষ্টকর। রপ্তানি তো আরো দূরের ব্যাপার।

দেশের ইলেকট্রনিকস খাতে বিনিয়োগ করেছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি ভিশন ব্র্যান্ড্রে বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য বাজারে এনেছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেডের তথা আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রথীন্দ্রনাথ পাল (আরএন পাল) কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে দেশের ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হতো। এখন দেশেই পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিযোগিতা বাড়লেও বাজারও কিছুটা সংকুচিত হয়ে যায়। হঠাৎ করে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোতে পণ্যের দাম বাড়বে, এতে ভোক্তা-উৎপাদক উভয়ের ওপর চাপে বাড়বে। অন্যদিকে নগদ প্রণোদনা কমিয়েছে সরকার। যদি রপ্তানির ক্ষেত্রেও কঠিন নিয়ম আরোপ করা হয়, তবে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজার দুই জায়গাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে উৎপাদকদের। কোথায় শক্ত হতে হবে আর কোথায় ছাড় দিতে হবে তা সরকারকে বুঝতে হবে। শুধু আইএমএফের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করলে হবে না।

মিনিস্টার হাই টেক পার্ক ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের হেড অব  ব্র্যান্ড মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন সোহেল কিবরিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে ইলেকট্রনিক কম্পানিগুলোর ওপর সরকার সম্প্রতি যে ভ্যাট ট্যাক্স বাড়িয়েছে তার ফলে কম্পানিগুলোর উৎপাদন এবং আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সরাসরি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকরা হয়তো পণ্যের দাম বেশি হওয়ায় তাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে দ্বিধায় পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, উৎপাদন ও আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে আমাদের পণ্যের মূল্য বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়বে। ফলে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং সামগ্রিক ইলেকট্রনিকস মার্কেটে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভিসতা ইলেকট্রনিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান হোসেন আকাশ বলেন, পৃথিবীর কোথাও উৎপাদনমুখী শিল্পে এত ভ্যাট-ট্যাক্স নেই, যতটা বাংলাদেশে আছে। বাংলাদেশের করনীতি ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা মানের পণ্য কেনা ভোক্তার অধিকার। কিন্তু রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে এনবিআর গবেষণা ছাড়া শিল্পের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়াচ্ছে, যা শিল্পকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। করপোরেট কর বাড়ানোয় ইলেকট্রনিকস শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই লোকসান সইতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

২০০৯ সাল থেকে ইলেকট্রনিকস শিল্পের কর ছাড় দিয়ে আসছে এনবিআর। শিল্পের করপোরেট কর, কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর এবং উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেওয়ায় দেশে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ খাতে কাজ করছে লক্ষাধিক শ্রমিক।

জানা গেছে, খুচরা যন্ত্রাংশসহ পূর্ণ ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, এয়ার কন্ডিশনার ও কম্প্রেসার তৈরির প্রতিষ্ঠানকে করছাড় দিয়ে ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর এনবিআর একটি আদেশ জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপনে শর্ত সাপেক্ষে ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ইলেকট্রনিকস শিল্পের করপোরেট কর ১০ শতাংশ করা হয়। উৎপাদনের তারিখ হতে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতো।

ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেছবাহ উদ্দিন বলেন, ২০৩০ সালে আমাদের স্থানীয় হালকা-প্রকৌশল শিল্পটি ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের শিল্পে পরিণত হবে। এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা খাতের সংস্কার, নীতি-সহায়তা ও নীতির ধারাবাহিকতা আবশ্যক, যা স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।