পাঁচটি দেশ সফর শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ইতালির রোমে পৌঁছালেন, তখনই কলোসিয়ামের সামনে দেখা গেল সেই চেনা দৃশ্য। রাতের কলোসিয়ামের আলোয় হাসিমুখে একটি সেলফি তুলে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলেন— “ওয়েলকাম মাই ফ্রেন্ড টু রোম।” সাথে সেই বিখ্যাত সংলাপ— “হ্যালো ফ্রম দি মেলোডি টিম।”
মেলোডি বলতে আগে আমরা বুঝতাম মিষ্টি কোনো সুর, চমৎকার কোনো সংগীত কিংবা পুরনো দিনের সেইসব ধ্রুপদী রোমান্টিক গান। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আধুনিক যুগে ‘মেলোডি’ শব্দের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন মেলোডি মানে—মেলোনি আর মোদির সন্ধিরূপ। দুই প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও নরেন্দ্র মোদীর বহুল আলোচিত ও ভাইরাল বন্ধুত্বের নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডনেম। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে জলবায়ু সম্মেলনেও এমন সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন মেলোনি ও মোদি।
তাদের বহুল আলোচিত সেলফি কেবলই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম কিংবা দুটি দেশের নেটিজেনদের সস্তা বিনোদনের খোরাক নয়। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি হালকা চালের রোমান্টিক কমেডি মনে হলেও, এই চোখধাঁধানো ক্যামেরার পেছনের গল্পটি আসলে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিরেট বৈশ্বিক কৌশল। এই ভাইরাল কেমিস্ট্রি আসলে টেবিলের ওপরের অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষার একটি মনস্তাত্ত্বিক আবরণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ‘গ্লোবাল পাওয়ার কাপল’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করে, তখন পর্দার আড়ালে আসলে হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ চলে।
বর্তমানে এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে ভারত ও ইতালির সম্পর্ক। দুই দেশ ‘যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ২০২৫–২০২৯’-এর আওতায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সবুজ শক্তি এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
ভারত ও ইতালির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬৭৭ কোটি ডলার। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতে ইতালীয় বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬৬ কোটি ডলার।
ফলে, মেলোনির টাইমলাইনে যখন ভালোবাসার ইমোজি আর আগুনের ট্রেন্ড চলে, তখন দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকরা আসলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো-প্যাসিফিক) অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক বলয় নিশ্চিত করার কৌশল আঁকেন।
‘মেলোডি’ জুটির এই দীর্ঘস্থায়ী ডিজিটাল প্রচারণার সমান্তরালে দুই দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক নাটকীয় মোড় এসেছে। বর্তমানে ভারত ও ইতালি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, যৌথ সামরিক মহড়া এবং মহাকাশ ও সাইবার নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রযুক্তি আদান-প্রদানে যৌথভাবে কাজ করছে।
ভারতের দরকার প্রতিরক্ষা খাতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো, অন্যদিকে ইতালির বিশ্বখ্যাত প্রতিরক্ষা জায়ান্টদের জন্য ভারতের চেয়ে বড় সামরিক বাজার আর হতে পারে না। ফলে, রোমের ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের সামনে হাসিমুখের যে ছবিটি লক্ষ লক্ষ ভিউ পায়, তা আসলে দুই দেশের নৌ-নিরাপত্তা এবং অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের যৌথ উৎপাদনের একটি প্রতীকী অনুমোদন।
মেলোনি-মোদি ‘মেলোডি’ রসায়নের পেছনে আবার নেটিজেনদের আগ্রহের একটা মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে। জর্জিয়া মেলোনি ইতালির প্রথম নারী ও কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী, যিনি ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক দারুণ গতিশীলতা নিয়ে এসেছেন।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদী ভারতের রাজনীতিতে এক চিরন্তন ‘বিবাহিত ব্যাচেলর’ হিসেবে পরিচিত, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। বিয়ের কিছুদিন পরই তিনি সংসার ছেড়ে আরএসএস-এর প্রচারক হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। যদিও স্ত্রী যশোদাবেনের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়নি, তবুও দীর্ঘদিন তিনি ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রেখেছিলেন।
স্বভাবতই, এই দুই ভিন্ন ঘরানার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যখন ফ্রেমবন্দী হন, তখন দুই দেশের নেটিজেনদের আর তর সয় না। কলোসিয়ামের সামনে তোলা সেই ছবি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৫ লক্ষের বেশি ভিউ পেয়ে যায়, কমেন্ট বক্সে ভারতীয় নেটিজেনরা কেউ কেউ মেলোনিকে ‘ভাবীজি’ বানিয়ে পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্যও করে ফেলেন!
আধুনিক রাজনীতি ও কূটনীতির সবচেয়ে বড় শিল্প হলো ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ বা বর্ণনামূলক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। রোম সফরের মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আগেও নরওয়েতে সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি জাদুকরী সেলফিই যথেষ্ট! রোমের সেই একটিমাত্র হাসিমুখের ছবি টাইমলাইনের সমস্ত নেতিবাচক সমালোচনাকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল কেবলই হৃদয়, আগুন আর হ্যাশট্যাগ ‘মেলোডি’।
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘ইউরোপের উদ্দেশে’ কবিতায় ইতালিকে বলেছিলেন ‘স্নিগ্ধ’। তিনি লিখেছিলেন— “ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন, এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন।” বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই বৈপরীত্য চমৎকারভাবে মিলে যায়। ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদী যেন এক অগ্নিঝরা বৈশাখ— তীব্র রাজনৈতিক ঝড় ও প্রচণ্ড প্রচারণার নাম।
অন্যদিকে জর্জিয়া মেলোনি যেন ইউরোপের বরফ-গলা বসন্ত— প্রাণবন্ত, ক্যামেরা-সচেতন এবং ভীষণভাবে মিডিয়া-স্মার্ট। এই দুই বিপরীত উপাদানের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে ভাইরাল যুগল।
যোগাযোগ বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘পার্সোনালাইজড পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন’ বা ব্যক্তিসর্বস্ব রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ‘ইমেজ পলিটিক্স’। রাষ্ট্রনেতারা এখন নিজেদের শুধু কঠোর ও ধরাছোঁয়ার বাইরের ব্যক্তিত্ব হিসেবে না রেখে, জনগণের কাছে মানবিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহজপ্রাপ্য হিসেবে তুলে ধরতে চান। তাই আজকের বিশ্বে কূটনীতি আর শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুদ্ধদ্বার বৈঠককক্ষের যৌথ বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইনস্টাগ্রাম পোস্ট, হ্যাশট্যাগ আর ভাইরাল সেলফিই এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে নরম কিন্তু শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠেছে।
(লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও নিউ মিডিয়া গবেষক)