Image description

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘ সময় ধরে একটি ভালো অবস্থানে আছে। মূলত স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধার আওতায় ইইউতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর সেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শক্ত ভিত্তি গড়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এই অবস্থান এখন আগের মতো স্বস্তিদায়ক নয়।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৫ সালজুড়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫-এ ইইউতে পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে দুই দশমিক ২৭ শতাংশ। বাংলাদেশের ওপর এই মন্দার বড় প্রভাব পড়েছে, যেখানে ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ১২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র একাধিক দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় অনেক রপ্তানিকারক বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় বাজারই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ফলে বিভিন্ন দেশ ইইউতে পণ্য পাঠাতে আগ্রাসীভাবে ঝুঁকছে। এর স্বাভাবিক প্রভাব হিসেবে ইউরোপে পোশাকের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়েছে এবং ইইউয়ের বাজারে পোশাকের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে চার দশমিক ১৪ শতাংশ। এই সময়ে নিটওয়্যার পণ্যে রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে পাঁচ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে কমেছে এক দশমিক ৮৭ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির বদলে এই পতন রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইইউতে মোট তৈরি পোশাক আমদানি বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দুই দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। তবে আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও গড় একক দাম কমেছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। এই মূল্যচাপের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও। ২০২৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়ে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও একক দাম কমেছে তিন দশমিক ৮৪ শতাংশ।

বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পতনের চিত্র স্পষ্ট হয়। ওই মাসে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। সরবরাহের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও একক দামের বড় পতন রপ্তানি আয়ে ধাক্কা দিয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদ্য ঘোষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আলোচনা শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এই চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় অনুমোদন পেলে ২০২৭ সালে এটি কার্যকর হবে। তখন ভারতীয় পোশাকের ওপর ইউরোপে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। শুধু পোশাক নয়, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও গহনাসহ আরো কয়েকটি খাতেও শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি কয়েকগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ইউরোপে বাংলাদেশের যে বাজার রয়েছে, তার বড় অংশ নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া দিল্লি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই যায় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বাজারে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে কম উৎপাদন ব্যয় ও নীতিগত সহায়তার কারণে দেশটি দ্রুত ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, ইইউ বাজারে টিকে থাকতে হলে এখন শুধু পরিমাণ নয়, মূল্য ও মানের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো যখন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রণোদনা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ না করলে ইউরোপে বাংলাদেশের বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান ছাড়া ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চীন ও ভারতের আগ্রাসী রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক বেশি শুল্কের কারণে তারা কম দামে ইইউতে রপ্তানি করছে। এ কারণে সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক লুটপাট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। যেখানে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা বাড়িয়ে নিজেদের সক্ষমতা জোরদার করছে। সেখানে আমাদের সরকারিভাবে সহায়তা না বাড়ালে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।