Image description

দেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় গ্রাহকদের আস্থা ও ভরসার ঠিকানা ছিল শরিয়াহভিত্তিক তথা ইসলামি ব্যাংকগুলো। আমানত, বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স আহরণে আস্থার জায়গায় ছিল এসব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের আশীর্বাদপুষ্টদের লুটপাটের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ব্যাংকগুলো। অনিয়ম, জালিয়াতি ও নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে লুটপাটের মাধ্যমে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলা হয় এসব ব্যাংককে।

 

এ কারণে তীব্র তারল্যসংকটে গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারেনি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা তলানিতে নেমে আসে। ব্যাংকগুলোর সব সূচকেই ধস নামে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসে ব্যাংকগুলোতে জালিয়াতি ও লুটপাটের চিত্র।

বাড়তে থাকে গ্রাহকদের আমানতের টাকা উত্তোলনের চাপ। এর ফলে আর্থিকভাবে চরম দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করে।

খাতবিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের পাওনা টাকা আটকে থাকায় তাঁরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন।

তবে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় তাঁদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানত, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যসহ প্রায় প্রতিটি সূচকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এক মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা
এক মাসের ব্যবধানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। গত জুলাই মাসে যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে আগের বছরের একই সময়ে (আগস্ট ২০২৫) এই আমানত কমেছে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা
ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে বিনিয়োগে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর অবদান অব্যাহত রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাস শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। জুলাই শেষে বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮ কোটি টাকা। অপরদিকে, ২০২৫ সালের আগস্টে বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে, গত এক বছরে এসব ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

বৈদেশিক বাণিজ্যে মিশ্র প্রবণতা
বৈদেশিক বাণিজ্যেও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্ট মাসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। এটি জুলাইয়ের ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। আগস্ট মাসে রপ্তানি আয় এসেছে ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা জুলাইয়ে ছিল ৫৬ কোটি ডলার। অর্থ্যাৎ রপ্তানি আয় জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে কমেছে।

রেমিট্যান্সেও উল্লম্ফন, এক মাসে বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার

প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখিয়েছে। গত আগস্ট মাসে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। জুলাই মাসে যা ছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত না পাওয়ায় এসব ব্যাংকের প্রতি একধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। একীভূত পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে কিছুটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে পারলেই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

দেশে মোট ইসলামি ধারার ব্যাংক রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।

শীর্ষনিউজ