অর্থনীতির মন্দা ও নির্মাণ কাজের নিম্নগতিতে সংকটে পড়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। খেলাপি হওয়ার উপক্রম হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ। এ অবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া স্থগিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বরাবর আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ঋণখেলাপ এড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা চালু রাখার বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাতের অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকও।
এ ধরনের বিপত্তিতে এর আগে একই সুবিধা চেয়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগ্রুপ সিটি গ্রুপও। প্রতিষ্ঠানটির ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া ঠেকাতে চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা স্থগিত করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিটি গ্রুপ এখনো এ সংকট থেকে বের হতে পারেনি।
ঋণের খেলাপ ঠেকানোর পাশাপাশি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখতে কার্যকরী মূলধন সুবিধা অব্যাহত রাখার সুযোগও চেয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম সাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব সুবিধা চাওয়া হয়।
কোম্পানিটির দাবি, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) খেলাপি সংক্রান্ত প্রতিবেদন তাদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ এবং প্রস্তাবিত ঋণ পুনর্গঠন ও অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করছে। এ কারণে চার মাসের জন্য জিপিএইচ ইস্পাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সিআইবি-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা শিথিল বা এ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে বিবেচনার অনুরোধ করেছে কোম্পানিটি। এ চার মাসের মধ্যে কোম্পানি ও এর ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেয়ার আবেদনও করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জিপিএইচ ইস্পাতের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটি যে মানের ও দামের রড উৎপাদন করে, তা ব্যবহার হয় মূলত সরকারি বড় প্রকল্পে। এখন সরকারি বড় প্রকল্পের কাজ কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিপদে পড়েছে। আর্থিক সংকট প্রকট হয়ে পড়ায় অনেক ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কাছ থেকে সহায়তার আশ্বাস মিলেছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পুনর্গঠন ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে বন্ড ছেড়ে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হবে৷ এটি বাস্তবায়ন হলেই জিপিএইচ ইস্পাত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
চিঠিতে জিপিএইচ ইস্পাত বলেছে, প্রস্তাবিত চার মাসের এই সুবিধার উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির আর্থিক পুনর্বাসন, ঋণ পুনর্গঠন, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কোনো নিয়ন্ত্রণগত বাধ্যবাধকতাকে এড়ানোর উদ্দেশ্য থেকে এ আবেদন করা হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেয়া চিঠিতে জিপিএইচ ইস্পাতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোম্পানিটি বর্তমানে আর্থিক অবস্থান পুনর্গঠন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এজন্য আগামী চার মাসের মধ্যে পাঁচটি কাজ সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এগুলো হলো—
১. কোম্পানির বিদ্যমান ব্যাংক দায়-দেনার চলমান পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা,
২. সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, অনুমোদন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা,
৩. স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন সুবিধা ব্যবস্থা করা ও চালু রাখা,
৪. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের আলোকে কোম্পানির আর্থিক পুনর্গঠন ও ঋণের বোঝা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, এবং
৫. কোম্পানির নগদ প্রবাহের অবস্থা উন্নত করা এবং ব্যাংক খাতের দায়-দেনা পরিশোধ ও নিয়ন্ত্রণগত বাধ্যবাধকতা পরিপালনের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।
চিঠিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা, তারল্য ব্যবস্থাপনা, আর্থিক দায়-দেনা পুনর্গঠন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিএসইসি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলীকরণ এবং সমন্বিত আর্থিক পুনর্গঠনের বিষয়টিকে বিবেচনা করা।
ওই সভায় প্রস্তাবিত কমিটির পরবর্তী সভা আসন্ন অক্টোবর ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রস্তাবিত ঋণ পুনর্গঠনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা ও বিবেচনা করা হবে বলে প্রত্যাশা করছে জিপিএইচ ইস্পাত।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেয়া চিঠিতে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, ব্যাংকিং সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখবে জিপিএইচ ইস্পাত। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের জারি করা প্রযোজ্য সব আইন, বিধিবিধান, ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ও নির্দেশনা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা হবে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক চার মাসের জন্য সিআইবি-সংক্রান্ত শিথিল অবস্থান গ্রহণ বা এ থেকে অব্যাহতি দিলে কোম্পানি ও এর ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর চলমান আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলোর তথ্যমতে, জিপিএইচ ইস্পাতকে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)৷ প্রতিষ্ঠানটির সমস্যাগুলো নির্ধারণ ও এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিতে ইউসিবির নেতৃত্বে সাত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে একটি জোট গঠন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ পরামর্শের ভিত্তিতেই গ্রুপটিকে নীতি সহায়তা দেবে।
এ বিষয়ে জানতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।