Image description

মধ্যপ্রাচ্যে (পশ্চিম এশিয়া) চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল, গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস এবং বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো। ১৩৪টি নিটওয়্যার কারখানায় পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানায় ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল কিংবা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া ৭৮ শতাংশ কারখানা তাদের উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। কারখানাগুলো আরও জানিয়েছে, এই সংকটের ফলে শিপমেন্টে বিলম্ব ঘটছে এবং ক্রেতাদেরকে ছাড় দেওয়া দামে পণ্য দিতে হচ্ছে।

এই সংকটের মধ্যেই সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ (লিটার প্রতি ২০ টাকা) পর্যন্ত বৃদ্ধি করার পর কারখানাগুলোর ওপর চাপ আরও তীব্র হয়েছে।

সরকারের ভাষ্যমতে-গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম এবং জাহাজ পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পর এই মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ অবদান রাখে এই খাত।

বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়, নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে কিছু কারখানা মালিক উড়োজাহাজে পণ্য পরিবহন কিংবা মূল্যে ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে তাদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা চেপেছে।

পোশাক রপ্তানিকারক শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘আমাদের মুনাফার হার ইতোমধ্যেই বেশ কম, এর ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তা আরও কমিয়ে দেবে। প্রতিযোগিতা বজায় রেখে এই বাড়তি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ সামাল দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।’

আজিম জানান, এক কানাডীয় ক্রেতা ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার দেওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার পোশাকের অর্ডার দিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়াকেই তিনি এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।

চলমান সংকট সামাল দিতে কোনো কোনো পোশাক কারখানা নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে।

ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, নেক্সটের মতো বড় ক্রেতাদের পোশাক সরবরাহকারী ফোরএ ডাইং অনেকটাই চলছে সৌর বিদ্যুতে। ২০১৯ সাল থেকে ফোরএ সৌর প্যানেলসহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। ফলে চলমান লোডশেডিংয়ে তারা কারখানায় মেশিন চালু রাখতে পারছে।

ঢাকার শহরতলীতে ফোরএর কারখানা। ৭ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কারখানার ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে সোলার প্যানেল। বাকীটা আসছে ডিজেলে চলা জেনারেটর থেকে।

ফোরএ’র মালিকদের একজন আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, ‘আমরা কখনোই একক উৎসের শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম না। সবকিছুর জন্যই আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা ছিল। তবে ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। প্রথমে তেল সংকট ছিল, এরপর দেখা দিল গ্যাস সংকট।’

তিনি জানান, ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে তাদের উৎপাদন খরচ ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে প্রতি মাসে তাদের জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ৫০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।

ভবিষ্যতের সংকট এড়াতে ফোরএ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বড় ব্যাটারি সিস্টেম স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। যাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও কারখানা কয়েক ঘণ্টা সচল রাখা যায়।

রাকিব বলেন, ‘আমরা বাড়তি খরচটুকু কোনোমতে সামলে নিতে পেরেছি, কিন্তু সব কারখানার পক্ষে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।’

‘ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড’-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, কিছু কারখানা হয়তো অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বহন করতে পারবে। কিন্তু গ্যাস সংকট এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটই চিন্তার প্রধান কারণ। বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে যখন এসব সমস্যা এতটা তীব্র নয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতায় সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতই বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, ‘পোশাক সরবরাহকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা বাজার ধরে রাখব নাকি পিছিয়ে পড়ব, তা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি তার ওপর।’