ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপের পাশাপাশি এখন অবৈধ পন্থায় নিয়োগ পাওয়ার দায়ে চাকরিচ্যুত কর্মী ও গ্রাহক ফোরামের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ সহায়তা দিলেও আমানত কমে যাওয়া, বড় অঙ্কের লোকসান এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ এখন ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পটিয়ার চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর পৃথক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এতে ২০ থেকে ২৫ জন আহত হন। আওয়ামী আমলে অবৈধ পন্থায় চাকরি পাওয়াদের মধ্যে যারা নিয়ম অনুযায়ী চাকরি হারিয়েছেন তারা স্বপদে ফেরার দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেন।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করে আসছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির দাবিগুলো হলো—সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা; ২০১৭ সালে পরিবর্তিত মালিকানা ফিরিয়ে দিয়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃত ও আদি মালিকদের হাতে দেওয়া; ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা; বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা; ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানতের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা; ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন দ্রুত সংস্কার ও কোডিফাই (ঈড়ফরভু- কোনো আইন, নিয়মকানুন বা নীতিকে সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিতভাবে কোনো সংকলন বা বিধিমালার (ঈড়ফব) রূপ দেওয়া) করা।
এদিকে, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে ব্যাংকটির সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পরিচালনা পর্ষদ ও এমডি না থাকায় ইসলামী ব্যাংকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরিণ সূত্র।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম খান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, ইসলামী ব্যাংক নিঃসন্দেহে দেশের শীর্ষ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। ফলে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে সরকারকে ভালোভাবে চিন্তা করা উচিত।
চলমান সমস্যাগুলো দক্ষতার সঙ্গে সমাধান করতে হবে। তা না হলে এই সংকট ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সরাসরি রাষ্ট্রীয় মদদে ইসলামী ব্যাংক দখল করে চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম বা এস আলম। এরপর ব্যাংকটি থেকে নামে বেনামে জাল জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেন কয়েক লাখ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, আদিপত্য ধরে রাখতে অবৈধভাবে নিজ জন্মস্থান চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কয়েক হাজার লোক নিয়োগ দেন ইসলামী ব্যাংকে।
ব্যাংকটির অডিট তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানা হয়নি। এক উপজেলা থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার কর্মকর্তা কর্মচারি। কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই কেবল সিভির (জীবন বৃত্তান্ত) মাধ্যমে এসব জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ভুয়া শিক্ষাসনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করেও নিয়োগ পেয়েছেন অনেকে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পর ব্যাংকটির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায় এস আলম পরিবার। এরপর ইসলামী ব্যাংকে বিশেষ অডিট করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই অডিটে উঠে আসে অনিয়মের এসব চিত্র।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজনের নির্দেশ দেয় ইসলামী ব্যাংককে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা নেন ব্যাংকটি, কিন্তু পটিয়ার অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অযোগ্য ও অথর্ব কর্মকর্তারা উত্তীর্ণ হবে না ভেবে পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
ওই সময় যারা অংশ নিয়েছেন তাদের ৮২ শতাংশই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদেরকে চাকরিতে বহাল রাখে। অকৃতকার্য ১৮ শতাংশকে চাকরিতে বহাল করতে নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করে ইসলামী ব্যাংক। এই পরীক্ষা আয়োজনের আগে ব্যাংকের পক্ষ থেকে অকৃতকার্য ১৮ শতাংশকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দ্বিতীয় মূল্যালয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণদেরও চাকরিতে বহাল করে ব্যাংকটি। এখন যারা রাস্তায় চাকরি ফেরত চেয়ে আন্দোলন করছেন এরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে পরীক্ষায়ই অংশ নেয়নি। আগেও এরা চাকরি নেওয়ার সময় কোনো নিয়োগ পরীক্ষা দেননি।
এদিকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্থিরতার প্রভাবে তারল্য সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। গ্রাহকদের মধ্যে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়লে কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাংকটির নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে ২ হাজার ৫০শ’ কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়। একই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সহায়তার পর ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এর ফলে জুন শেষে ব্যাংকটির সংরক্ষিত আয় ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ছয় মাসে ব্যাংকটির আমানত কমেছে প্রায় ১৭ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর বড় একটি অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে কয়েকটি ব্যাংকে। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ইসলামী ব্যাংকের যার পরিমাণ প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গত বছরের শেষেও ছিল ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। তখন কোনো একক ব্যাংকের ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একই সময়ে ব্যাংকটির তারল্য সংকটও প্রকট হয়েছে। গত জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক দফায় ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়। একপর্যায়ে তিন দিনে ব্যাংকটিকে মোট ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
ব্যাংকটির সংকটের পেছনে অতীতের ঋণ অনিয়ম ও পরিচালনাগত দুর্বলতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ২০১৭ সালে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর মূলত দুর্বল হয়ে পরে প্রতিষ্ঠানটি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পর ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজ করার আদেশও এসেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা কঠিন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ও অনিয়মিত বিনিয়োগ আদায়, সম্পদের মান উন্নয়ন এবং ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোকে স্থিতিশীল করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংক এখন এমন একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একদিকে তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের লোকসান ও আমানত কমে যাওয়ায় আর্থিক ভিত্তি শক্ত করার চাপ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরিচ্যুত কর্মীদের আন্দোলন ও গ্রাহক ফোরামের পাল্টা কর্মসূচি। ফলে ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অবৈধ পন্থায় নিয়োগ পাওয়া চাকরিচ্যুতদের পুর্নবহাল করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনেও কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেকোনো সময় আসতে পারে ঘোষণা।
শীর্ষনিউজ