Image description

মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ফের সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। একলাফে লিটারে দাম বেড়েছে ২০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর গত ১৮ এপ্রিল তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। সবমিলিয়ে সরকারের সাত মাসে সব জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি বাড়ল প্রায় ৪০ টাকা।

‎জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো বেশি কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা।

‎বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির চরচাকে বলেন, ‘‘এক লাফে জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধির চাপ সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে এবং জীবনযাত্রার সার্বিক খরচ বেড়ে যাবে।’’

‎ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ায় বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভাড়া সরাসরি বৃদ্ধি পাবে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় দূর-দূরান্ত থেকে মালামাল আনা-নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হবে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে চাল, ডাল, শাকসবজিসহ বাজারের প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও একদফা বাড়বে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (‎বিবিএস) তথ্য অনুযায়ি, আগস্ট মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হবে বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম।

শামসুল আলম ‎চরচাকে বলেন, ‘‘সরকার ভর্তুকির বোঝা কমাতে রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি নিল।’’ তিনি বলেন, ‘‘রেকর্ড বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর চার মাসের ব্যবধানে তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়াল। এতে আরো একদফা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়বে। সরকারি চাকরিজীবী বাদে দেশের বেশির ভাগ মানুষের অবস্থা করুণ। তাদের ক্রয় ক্ষমতা আরো কমবে। মানুষের যদি কেনার সামর্থ্য না থাকে তাহলে সরকারি কার শুল্ক-কর কোথা থেকে পাবে? মানে, সরকার তেলের দাম বাড়িয়ে যতটুকু ভর্তুকি কমাবে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাবে।’’

‎অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির বলেন, ‘‘বাংলাদেশে চাষাবাদ এবং সেচ পাম্পের একটি বড় অংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত চাল ও অন্যান্য ফসলের মূল্যের ওপর পড়বে।’’

‎মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প নেই বলছে সরকার‎

তেলের দাম বাড়ানোর প্রজ্ঞাপনের সাথে এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে একটি প্রেসনোট জারি করেছে সরকার। এতে দাবি করা হয়, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।

‎এছাড়া ভারত, মায়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, মালদ্বীপসহ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দাম কম হওয়ায় জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি তেলের পাচার বন্ধও এই মূল্যবৃদ্ধির একটি উদ্দেশ্যে বলে জানায় জ্বালানী বিভাগ।

সরকারের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি খাতেও প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে হচ্ছে। সেজন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চলমান রাখা এবং জ্বালানি তেল পাচার রোধে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

‎রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানানো হয়। নতুন দর অনুযায়ী, ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। যা এরইমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

এতদিন ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।

সবশেষ চলতি বছরের জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়।

এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও সেই দাম বহাল ছিল।

দেশে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই বছর ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করেছিল। পরে সমালোচনার মুখে ৫ টাকা কমানো হয়। এরপর থেকে জ্বালানি তেলের দাম নানা কারণে ঊর্ধ্বমুখী।

‎‎২০২৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি শুল্ক ও ডলারের বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে।