গত ১৫ বছরে দেশের অর্থনীতি প্রায় দ্বিগুণ হলেও এর বিপরীতে এক উল্টো চিত্র দেখা গেছে পুঁজিবাজারে। অর্থনীতির বিশাল সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে উল্টো আকারে ছোট হয়ে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজার। ২০১০ সালের ধসের পর থেকে বাজারটি আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান স্থবিরতা, নানা অনিয়ম, আইপিও সংকট, সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় নিয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু আলী।
আমার দেশ : ২০১০ সালের ধসের পর থেকে শেয়ারবাজার এখনো পর্যন্ত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আবু আহমেদ : ২০১০ সালের ধসের পর থেকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বর্তমানে একধরনের ‘নন-ফাংশনাল মার্কেট’ বা অকার্যকর বাজারে পরিণত হয়েছে, যা কোনো রকমে কেবল চলছে। গত ১৫-২০ বছরে দেশের অর্থনীতি দ্বিগুণ হলেও শেয়ারবাজারের আকার উল্টো অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বিশ্বে বিরল।
এর মূল কারণ হলো সুশাসনের অভাব (ব্যাড গভর্ন্যান্স) এবং নিয়ন্ত্রণমূলক দুর্বলতা। অতীতে পর্যাপ্ত খোঁজখবর বা ডিউ ডিলিজেন্স ছাড়াই অনেক নন-পারফর্মিং কোম্পানিকে আইপিওর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা দুই-তিন বছরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাজারের মূল চালিকাশক্তি আর্থিক খাতের অবস্থা খুবই নাজুক; গত ১৫ বছরে ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ, লিজিং কোম্পানির ৮০ শতাংশ এবং বীমা কোম্পানির প্রায় ৬০ শতাংশ নন-ফাংশনাল বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে একসময়ের ভালো বা ব্লু-চিপ শেয়ারগুলো আজ ধুঁকছে।
আমার দেশ : শেয়ারবাজারের এই বেহাল দশার মূল কারণগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
আবু আহমেদ : শেয়ারবাজারের এই বেহাল দশার পেছনে মূলত সুশাসনের অভাব, নিয়ন্ত্রণমূলক দুর্বলতা এবং মানহীন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেওয়া দায়ী। পর্যাপ্ত ডিউ ডিলিজেন্স বা খোঁজখবর ছাড়াই তালিকাভুক্ত হওয়ায় দুই-তিন বছরের মধ্যে কোম্পানিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে।
আইপিও অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই কোম্পানিগুলোর কারখানা বা ব্যবসা সরেজমিন পরিদর্শন করতে হবে। পাশাপাশি, দেখানো আয়ের হিসাবের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর নিয়মিত কর পরিশোধের বিষয়টি যাচাই করা জরুরি, তবেই প্রকৃত আয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে তারা যে গত কয়েক বছরের আয়ের হিসাব দেখাচ্ছে, তা কর পরিশোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, অর্থাৎ তারা নিয়মিত কর দিয়েছে কি না—সেটি যাচাই করা উচিত। তাহলেই প্রকৃত আয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
আমার দেশ : বাজারের প্রধান খাতগুলোর বর্তমান অবস্থা কেমন?
আবু আহমেদ : বাজারের মূল ক্ষেত্রগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। একসময় যেসব কোম্পানিকে ভালো শেয়ার বা ব্লু-চিপ স্টক বলে মনে করা হতো, সেগুলোর অনেকগুলোরই আজ খারাপ দশা। যেমন—ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো একসময় আয়ের দিক থেকে খুবই ভালো মানের কোম্পানি ছিল এবং শেয়ারহোল্ডারদের ভালো লভ্যাংশ ও সরকারকে প্রচুর রাজস্ব দিত। কিন্তু দুই-তিন বছর ধরে তাদেরও অধোগতি শুরু হয়েছে। এর মূল কারণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং চোরাই পথে আসা কর ফাঁকি দেওয়া অবৈধ প্রতিযোগীদের দৌরাত্ম্য। একইভাবে একসময়ের বাজার কাঁপানো কোম্পানি ‘সিঙ্গার’ বা অন্যান্য বিদেশি সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তলানিতে চলে গেছে।
ব্যাংকিং খাতের ভালো স্টকগুলোর ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কড়াকড়ি আরোপ করেছে, তখন সেগুলোর অবস্থাও রেড জোনে চলে গেছে। তবে আমি এখনো আশাবাদী যে, বাছাই করা ১০-১২টি ভালো ব্যাংক ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়াবে এবং বিনিয়োগকারীদের তাদের মধ্যেই থাকা উচিত।
আমার দেশ : সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে একসময় মিউচুয়াল ফান্ড বেশ জনপ্রিয় ছিল, এ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?
আবু আহমেদ : মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে একসময় সবাই অনেক কথা বলত যে, যারা শেয়ারবাজার কম বোঝেন, তারা যেন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখানে এসে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছে। ফান্ড ম্যানেজারদের কেউ কেউ জনগণের টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে গেছেন, আবার কেউ কেউ অস্তিত্বহীন বা ভুয়া আইটেম উচ্চমূল্যে মিউচুয়াল ফান্ডের কাছে বিক্রি করেছেন। আনফরচুনেটলি, অতীতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমতি নিয়েও এমন অনিয়ম হয়েছে। এক মিউচুয়াল ফান্ড তো জনগণের টাকা নিয়ে বিদেশেই পালিয়ে গেল! এর ফলে মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর থেকে মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ উঠে গেছে।
একসময় আইসিবির মিউচুয়াল ফান্ডগুলো অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজারে কৃত্রিমভাবে সাপোর্ট দিতে গিয়ে তারা চড়া দামে শেয়ার কিনেছে এবং ‘স্টপ লস’ না নেওয়ার সংস্কৃতির কারণে বড় লোকসানে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে, আইসিবি এখন বিশাল অঙ্কের ঋণ ও সুদের জালে জড়িয়ে পড়েছে। সরকার বা বড় কোনো নীতিগত সহায়তা ছাড়া আইসিবির পক্ষে এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।
আমার দেশ : সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? বিশেষ করে মার্জিন লোন নিয়ে যারা বিপাকে আছেন?
আবু আহমেদ : শিক্ষক জীবনে আমি কখনো শেয়ার ‘ব্যবসা’ নয়, বরং ‘বিনিয়োগে’র পরামর্শ দিয়েছি। কারণ বিনিয়োগ আর ব্যবসা এক নয়। বিশেষ করে ফাটকাবাজারির হাতিয়ার মার্জিন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ কখনোই উচিত নয়। এতে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমার পরামর্শ—মার্জিন ঋণ না থাকলে ধৈর্য ধরুন। আর ঋণ থাকলে মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সুদ মওকুফ করিয়ে এক্সিট নিন। মনে রাখবেন, কেবল অর্থনীতি চাঙা হলেই এবং ভালো কোম্পানি বাজারে এলে তবেই শেয়ারবাজার চাঙা হবে।
আমার দেশ : বর্তমান কমিশন বা নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এবং নতুন কোনো উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?
আবু আহমেদ : বর্তমান কমিশন বেশ পেশাদার এবং তাদের কাজে যথেষ্ট স্কিল ও নলেজ রয়েছে। তাদের কিছু পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। যেমন—বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য ‘ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের’ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আমাদের দেশে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করছে, কিন্তু সাধারণ জনগণকে মালিকানা দিতে চায় না। অথচ দেশের জনগণের কাছে মালিকানা বা পাবলিক ইন্টারেস্ট নিশ্চিত করা জরুরি। ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে তারা অতিরিক্ত মূলধন না তুলে তাদের বিদ্যমান শেয়ার থেকে কিছু অংশ সাধারণ জনগণকে দিতে পারবে। এতে দেশের বড় বড় উদ্যোক্তার পারিবারিক বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সম্পদ বণ্টনজনিত জটিলতাও দূর হবে।
আমার দেশ : ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিলে অতিরিক্ত বিনিয়োগ এবং সুদের হার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আবু আহমেদ : উচ্চ সুদের হার ও ট্রেজারি বিলে অতিরিক্ত বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পলিসি রেট বাড়ানোর ফলে মানি সাপ্লাই কমেছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বন্ধ কলকারখানা চালুর জন্য উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ পেতে সুদের হার আরও কমানো জরুরি।
আমার দেশ : দেশের শেয়ারবাজারকে পুরোপুরি কার্যকর ও গতিশীল করতে কী কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আবু আহমেদ : শেয়ারবাজারকে সত্যিকারের কার্যকরী করতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ করতে হবে। প্রথমত, বাজারে ভালো ও মানসম্মত নতুন কোম্পানির আইপিও বা লিস্টিং বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, করের হার কমাতে হবে এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বাজারকে কার্যকর করতে একটু সময় লাগবে, তবে বর্তমান কমিশন ও নীতিনির্ধারকরা সঠিক পথে কাজ শুরু করেছেন।
আমার দেশ : সরকারি লাভজনক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার ঘোষণা তো দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন দেখছি না কেন?
আবু আহমেদ : এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শেখ হাসিনার আমলে বিভিন্ন সময় কেবল ঘোষণাই দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি ও তালিকা তৈরি করে বসে আছে, কিন্তু সরকারি শেয়ার বিক্রির সেই কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত বা অর্ডার যেন ফাইলবন্দি হয়ে আছে। সরকারকে বলব, কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে ছাড়ুন।