পাঁচ সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যাত্রা শুরু করেছে বড় আর্থিক চাপ নিয়ে। নতুন ব্যাংকটির সামনে একদিকে প্রায় ৬৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা ব্যক্তি আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার দায়, অন্যদিকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ও প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার আগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই ব্যক্তি আমানতকারীদের।
এদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন নেওয়া শুরু হওয়ার পর প্রায় ৩৭ হাজার গ্রাহক প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছেন। যাচাই-বাছাই শেষে আগামীকাল রবিবার থেকে অনুমোদিত অর্থ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে গ্রাহকদের বর্তমান উত্তোলন দাবির পরিমাণের চেয়ে ব্যাংকটির সামগ্রিক আর্থিক দায় অনেক বেশি। কারণ নতুন ব্যাংকটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া নয়; বরং একই সঙ্গে বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং তারল্য ধরে রাখা।
১০০ টাকার ঋণে ৮৬ টাকাই খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশই খেলাপি। সহজ হিসাবে, ব্যাংকগুলো যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৮৬ টাকাই এখন শ্রেণিকৃত। এই বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে পাঁচ ব্যাংকের জামানতের মূল্য মাত্র ৪৮ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার ঋণের সমপরিমাণ জামানত নেই।
এস আলমের কব্জায় থাকা ৩ ব্যাংকের আর্থিত চিত্র
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের। ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ৬০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে ১০ শতাংশেরও কম। ফলে খেলাপি ঋণ আদায়ে শুধু জামানত বিক্রির ওপর নির্ভর করলে বড় অঙ্কের অর্থ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
এদিকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বড় অংশ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া, ঋণ পুনরুদ্ধার ও সম্পদ শনাক্তকরণসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
মূলধন ঘাটতি ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি
ঋণ পরিস্থিতির পাশাপাশি নতুন ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গা মূলধন। মার্চ শেষে পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত সমন্বয়কৃত মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঋণাত্মক সমন্বয়কৃত মূলধন ছিল ৬২ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৩০ হাজার ৯১ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৯ হাজার ৯৯৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৮২৫ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন ব্যাংকটি শুধু পুরোনো ব্যাংকগুলোর আমানত ও সম্পদ গ্রহণ করেনি; একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতিও উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
ব্যাংক বাঁচাতে ৮৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা
পাঁচ ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ সরকারি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা হিসেবে দিয়েছে ৫১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। এর বাইরে মূলধন সহায়তা হিসেবে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ডিপোজিট প্রোটেকশন ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ ব্যাংকের জন্য ৮৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার সরকারি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল সহায়তার পরও ব্যাংকটির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—খেলাপি ঋণ থেকে কত টাকা ফেরত আনা সম্ভব হবে। কারণ ঋণ আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা, ব্যাংকের তারল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় মেটাতে নতুন করে সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা
খেলাপি ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে। তবে এত বিপুলসংখ্যক মামলা থেকে দ্রুত অর্থ উদ্ধার করা সহজ হবে না। কারণ ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ শনাক্তকরণ, আদালতের প্রক্রিয়া, জামানত বাস্তবায়ন এবং সম্পদ বিক্রির মতো ধাপ পেরিয়ে অর্থ আদায় করতে সময় লাগতে পারে। এর পাশাপাশি আগের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সময়ে ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিটও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এই অডিটের ফলাফল নতুন ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ কোন ঋণ কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, কোথায় অনিয়ম হয়েছে, কারা সুবিধা নিয়েছে এবং ব্যাংকের সম্পদ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- এসব তথ্য বেরিয়ে এলে ঋণ আদায় ও দায় নির্ধারণের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।
আমানত ফেরত দেওয়াই এখন প্রথম পরীক্ষা
প্রায় ৬৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা ব্যক্তি আমানত থাকায় নতুন ব্যাংকের জন্য প্রথম পরীক্ষা হলো আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা।
ইতোমধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার গ্রাহক ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। আগামীকাল থেকে যাচাইকৃত আবেদনকারীদের অর্থ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান আবেদনের পরিমাণ মোট ব্যক্তি আমানতের তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক আমানতকারী একই সময়ে অর্থ ফেরত চাইলে ব্যাংকের তারল্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে পাঁচ ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওর বড় অংশ যখন খেলাপি এবং নতুন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও বিপুল, তখন আমানত ফেরত ও দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখতে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
একীভূতকরণে সংকট মিশেছে, সমাধান হয়নি
পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রশাসনিকভাবে পাঁচটি ব্যাংকের পরিবর্তে একটি ব্যাংক পরিচালনা করা সম্ভব হলেও তাদের পুরোনো আর্থিক ক্ষতি একীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায়নি। বরং নতুন ব্যাংকটি পেয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা সমন্বয়কৃত মূলধন ঘাটতি, ৪৮ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকার জামানত এবং ৬৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার ব্যক্তি আমানত। এর বিপরীতে ইতোমধ্যে ৮৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বড় অংশ উদ্ধার এবং বিপুল মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে। অন্যথায় আমানত সুরক্ষা ও ব্যাংক পরিচালনার ব্যয় মেটাতে ভবিষ্যতে আরও সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।