Image description

একজন মানুষের একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকার কোনো সুযোগ দেশের আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামোতে নেই। অথচ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে একে একে একই ব্যক্তির তিনটি পৃথক এনআইডি সচল রয়েছে! আর রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের এই ভয়ংকর নিরাপত্তা ত্রুটি ও জালিয়াতিকে কাজে লাগিয়ে সিটি ব্যাংক পিএলসির প্রায় ৮২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র।

এনআইডি সার্ভারের এই ভয়ংকর দুর্বলতার সুযোগে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ সুবিধা নিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে সিটি ব্যাংক। গত ২৭ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে ব্যাংকটির এভিপি ও সিনিয়র ম্যানেজার সহিদ-উল-হক মামলার আবেদন করেন।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয় ঋণ সুবিধা নেওয়া মো. মেহেদী হাসানকে। এছাড়া, ঋণের গ্যারান্টর মো. রফিকুল ইসলাম ও কাজী রাশেদুর রহমানসহ নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞাতনামা অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মামলায় আসামি করা হয়। পরে আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে অভিযোগটি উত্তরা পশ্চিম থানায় এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

যেভাবে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ আসামি মো. মেহেদী হাসান একটি এনআইডি ও টিআইএন সনদ জমা দিয়ে সিটি ব্যাংকের টঙ্গী শাখা থেকে ৬০ লাখ টাকার একটি অটো ঋণ (কার লোন) গ্রহণ করেন। যেখানে তার বাবার নাম মো. সাব্বির হোসেন ও মায়ের নাম মোসা. সাকিলা হোসেন দেখানো হয়। এই ঋণের মাধ্যমে কেনা গাড়িটি ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ নামে বিআরটিএ-তে নিবন্ধিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তিনি ওই অটো লোন শোধ করে ব্যাংকের আস্থা অর্জন করেন।

নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের চরম দুর্বলতা ও জালিয়াতিকে কাজে লাগিয়ে সিটি ব্যাংক পিএলসির প্রায় ৮২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। দেশের আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামোতে সুযোগ না থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি ৩টি সচল ও ভিন্ন পরিচয়ের এনআইডি ব্যবহার করে প্রতারণামূলকভাবে এসব কার লোন, পারসোনাল লোন ও ক্রেডিট কার্ড সুবিধা বাগিয়ে নেন

এরই সুযোগ নিয়ে একই এনআইডি ব্যবহার করে তিনি ৫ লাখ টাকার ক্রেডিট কার্ড এবং ২০২৬ সালের ১২ মার্চ আরও ৬০ লাখ টাকার নতুন অটো লোন ও ১০ লাখ টাকার পারসোনাল লোন অনুমোদন করিয়ে নেন। এই ঋণের মাধ্যমে কেনা গাড়িটিও ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ নামে বিআরটিএ-তে নিবন্ধিত করা হয়। 

জালিয়াতির চরম রূপ দেখা যায় যখন আসামি দ্বিতীয় আরেকটি এনআইডি ও ভিন্ন টিআইএন ব্যবহার করে ব্যাংকের কার্ড ডিভিশন থেকে ভিআইপি ডুয়াল ক্যাটাগরি, ভিসা প্ল্যাটিনাম এবং ইসলামিক ডুয়াল ক্যাটাগরির আরও ৮ লাখ টাকার একাধিক ক্রেডিট কার্ড সুবিধা তুলে নেন। এই দ্বিতীয় এনআইডিতে তার বাবার নাম সাব্বির আলী ও মায়ের নাম জাহানারা বেগম এবং জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য প্রদান করেন।

 

আসামির প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে ২০২৬ সালের ৮ জুন। ওই দিন দ্বিতীয় এনআইডিটি ব্যবহার করে তিনি ব্যাংকটির উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ শাখায় আবারও ৬৮ লাখ টাকার নতুন একটি কার লোনের আবেদন করেন। ঋণ বিতরণের সময় নথিপত্র যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে একই ব্যক্তির নামে দুটি ভিন্ন এনআইডি দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার নতুন ঋণ সুবিধা স্থগিত করে। অনুসন্ধানে ব্যাংক কর্মকর্তারা দেখতে পান, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে মেহেদী হাসান মোট ৮১ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।

ব্যাংকের কাছে স্বীকারোক্তি

ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মেহেদী হাসানকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সব অপকর্মের কথা স্বীকার করে আরও একটি ভয়ংকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাবা-মায়ের নামে ৩ নম্বর আরেকটি এনআইডি রয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে সচল! পরে তিনি ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়ে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সব পাওনা টাকা ও প্রতারণামূলকভাবে নেওয়া গাড়ি ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এদিকে, আসামির পুরো পরিবার বিদেশে থাকায় একাধিক ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তিনি যেকোনো সময় দেশ ছেড়ে চম্পট দিতে পারেন বলে আদালতে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজের স্পর্শকাতর তথ্য জাল করে ঋণ আত্মসাতের মামলায় সিআইডিকে সার্বিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, সার্ভারে ৩টি এনআইডি সচল থাকা একার পক্ষে সম্ভব নয়; এর পেছনে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে

এ বিষয়ে মামলার বাদী সহিদ-উল-হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ায় গ্রহীতা মেহেদী ও গ্যারান্টরদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলার আবেদন করি। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানাকে এটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা এবং সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই দুই এনআইডি ছাড়াও তার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পিতৃ-মাতৃ পরিচয়ের ৩ নম্বর আরেকটি এনআইডি রয়েছে বলে জানান।’

আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালিদ মনসুর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযোগটি এজাহার (এফআইআর) হিসেবে থানায় নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে, এখনও তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি।’

নির্বাচন কমিশনের কেউ না কেউ জড়িত: আদালত

মামলার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, আসামি একজন প্রতারক প্রকৃতির ব্যক্তি। তিনি এনআইডি কার্ডের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জাল করে ব্যাংক থেকে প্রায় ৮২ লাখ টাকা লোন নিয়েছেন। এই ঘটনা আসামির একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। যেহেতু কমিশনের সার্ভারে আসামির ৩টি এনআইডি কার্ড অ্যাকটিভ ছিল, তাই একজন ব্যক্তির ৩টি এনআইডি কার্ড হওয়া বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো সুযোগ নেই। যারা এনআইডি কার্ডের সাথে জড়িত ও এনআইডি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম দেখাশোনা করেন, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ এই ঘটনায় সহযোগিতা করেছেন।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডি শাখার দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে জড়িত আছেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা লোনগুলো ইতিপূর্বে মঞ্জুর করেছিলেন তারা এই জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত কি না, তা সার্বিক তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।