Image description

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যে মক্কা চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে আলোচননা চলছে বিস্তর। কেউ একে মুসলিম ন্যাটো বলছেন, তো কেউ দেখছেন চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি মার্কিন চাল হিসেবে। বাংলাদেশের এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়া বা না হওয়া নিয়েও রয়েছে নানা মত। অনেকেই একে বাংলাদেশের জন্য সুরক্ষা বর্ম হিসেবে দেখলেও কেউ কেউ এর কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন। আসলে কী?

এই চুক্তিতে বাংলাদেশও যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানানো হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সেখানে বলেন, “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মিডল ইস্টে যদি এমনও হয় যে ইসলামিক নেশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।”

 

আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে ভাবছে বলে উল্লেখ করেন। সঙ্গে এও বলেন, “এ প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, তবে এটি বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং, তা নিয়ে অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।’’

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সংযুক্তি নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে। এ বিষয়ে পরে আসছি।

প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক মক্কা চুক্তি আসলে কী? এতে কী আছে? তেমন ঘোরালো কোনো ব্যাপার অবশ্য নেই। বেশ সোজাসাপ্টা একটা বিষয়। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় হওয়া এ চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান–এই তিন দেশের কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে অন্য দুই দেশ তার পাশে দাঁড়াবে। তবে আক্রান্ত হলে ঠিক কত সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র পাঠাতে হবে, সে বিষয়ে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। চুক্তির আরেকটি লক্ষ্য হলো তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো–চুক্তিভুক্ত তিন দেশের তিন ধরনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক শক্তি, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র। সৌদি আরবের আছে জ্বালানি তেল। শুধু আছে বললে ভুল হবে, জ্বালানি তেলের জানা মজুতের সর্বোচ্চটাই তাদের। আর তুরস্ক? রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন দেশটি এই তিন দেশের মধ্যে একমাত্র ন্যাটো সদস্য। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিচারে দুটি দেশ রয়েছে। এর একটি তুরস্ক, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশই মুসলমান। আর আছে আলবেনিয়া, যার মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের মতো মুসলমান।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মোট ৩২টি দেশের জোট ন্যাটোয় থাকা দুই মুসলিমপ্রধান দেশ তুরস্ক ও আলবেনিয়ার কোনোটিই ইসলামি শাসনের অধীনে নয়। এরদোয়ান যতই মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, তার দেশ কিন্তু চলছে সেকুলার সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, ঘোষিতভাবে আর কি।

 

সে যাক, মক্কা চুক্তির আওতায় থাকা তিন দেশের সক্ষমতা তিন ধরনের। এদের মধ্যে এমন এক চুক্তি হয়েছে, যেখানে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুটিও নিজেদের আক্রান্ত হিসেবে মনে করবে এবং মিত্র দেশকে সক্রিয় সহযোগিতা করবে। এটাই চুক্তির মূল কথা। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি সৌদি আরব ও তুরস্ককে একটা সুরক্ষা বলয় দিচ্ছে। সৌদি আরবের পেট্রোডলার দিচ্ছে যুদ্ধ বা সংঘাতে মিত্র দেশকে ব্যয় নির্বাহের আশ্বাস। আর তুরস্ক? তুরস্কের আছে আধুনিক অস্ত্র তৈরির কারখানা। এটা এক দিক। আরেকটি দিক হলো–সদস্য হিসেবে ন্যাটোর অপরাপর দেশকেও এতে টেনে আনার একটা সক্ষমতা তার আছে। নিদেনপক্ষে সংঘাত নিরসনে তুরস্কের মাধ্যমে মক্কা চুক্তির আওতাধীন দেশগুলো বৈশ্বিক চাপ তৈরি করে নিজেদের পক্ষে শান্তির শর্ত প্রণয়নের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তিন দেশের আরেকটি মিল হলো–তারা প্রত্যেকেই মার্কিন মিত্র। ফলে চুক্তিভুক্ত তিন দেশ বেশ বুঝেশুনেই এ চুক্তির আওতায় এসেছে।

চুক্তির আরেকটি লক্ষ্য হলো তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। আন্তর্জাতিক শক্তি সমীকরণে এই ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ অর্থ কী, তা সবাই জানে। যদি না জেনে থাকেন, তবে বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য ডিক্টেটর’-এর চরিত্র অ্যাডমিরাল জেনারেল আলাদিনের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কিত ভাষণের দৃশ্যটি দেখে নিতে পারেন। এতেও ঠিক বিষয়টি ধরতে না পারলে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারেন–আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সামনে রেখে ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের মিশর, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের যে নানান সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত তৎপরতা, তা অঞ্চলটিতে ঠিক কী ধরনের শান্তি ও স্থিতিশীলতা দিয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের কথা যখন এলোই, তখন আরেকটু এগিয়ে এই জল্পনাও সামনে আনা যায় যে, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাতেই কি হচ্ছে? সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মসনদে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প এর বিরুদ্ধে এখনো কোনো কথা বলেননি। বরং স্বাগত জানিয়েছেন। এতগুলো সামরিক ঘাঁটি যে অঞ্চলে, এবং বিশেষত যে দেশ পেট্রোডলারের উৎস, সে অঞ্চল বা দেশের সংযুক্তিতে এমন একটি চুক্তি নিয়ে হোয়াইট হাউসের কোনো টেঁফো নেই। কেন? একটি কারণ তো অবশ্যই অস্ত্র বিক্রি। সামরিকীকরণ বা যুদ্ধংদেহী নানা কথাবার্তা অস্ত্র বিক্রির পালে হাওয়া দেয়। অনেকেরই মনে পড়বার কথা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদে কাতারের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকটের কথা। সে সময় সৌদি জোটভুক্ত চার দেশ ও তার বিপরীতে থাকা কাতার উভয় পক্ষের কাছে অস্ত্র বেচেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ব্যবসা রমরমা। এবারও হবে।

আর মুসলিম আত্মরক্ষা? যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হামলা চালায়, তাহলে সৌদি বা তুরস্ক বা পাকিস্তান কি হাতা গুটিয়ে তা প্রতিহত করতে নামবে? সোজা প্রশ্ন ইসরায়েল যদি তুরস্ক বা সৌদি আরবে হামলা করে বা পাকিস্তানে হামলা করে তখন যুক্তরাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়াবে? অর্থাৎ, এই চুক্তিতে থাকাটা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও শেষ বিচারে সঙ্গে পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।

কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র এমনটা কি শুধু অস্ত্র বিক্রির জন্যই চাইছে? সোজা উত্তর–না। কারণ এর সঙ্গে হিসাবে নিতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা চীনের বিপুল বিনিয়োগের বিষয়টি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রুশ অস্ত্রের বিদ্যমানতার বিষয়টি। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার। এই বিনিয়োগ এমন একটি চুক্তির ফলে শঙ্কার মুখে পড়বে। এতে চীন ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কাই বেশি। আর এই শঙ্কা থেকেই কিন্তু প্রস্তাব পেয়েও এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের সৌদি মিত্ররা এখনো যোগ দেয়নি। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন আছে। প্রস্তাব মিশরও পেয়েছে। কিন্তু তারাও যোগ দেয়নি। দোনোমনা করছে। আর আমরা প্রস্তাব পাওয়ার আগেই আগ্রহ প্রকাশ করে বসে আছি।

এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব বাংলাদেশ পায়নি। কিন্তু পেলে বিষয়টিকে বাংলাদেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে। তবে সংযুক্তিতে যে কথাটি তিনি বলেছেন, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ‘এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ উল্লেখ করে ‘অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই’ বলে যে বার্তা দিলেন, তা নিয়ে দু কথা বলার আছে।

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের এই চুক্তিকে গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্য নিরাপত্তার বা আত্মরক্ষার বর্ম হিসেবে চিন্তা করতে গেলে একটু কি সমস্যা হয় না? এ ক্ষেত্রে এমনকি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বলা ‘মক্কাকেন্দ্রিক’ আবেগকে আমলে নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয় যে, ফিলিস্তিনের সংকট বা গাজায় চলা হামলা ও মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে ইসলামি বিশ্বের দুই নেতা সৌদি আরব ও তুরস্ক আসলে কী করেছে? এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রসঙ্গও তোলা যেতে পারে। এই তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের টানা গণ্ডি কি পেরিয়েছে ইসরায়েল ইস্যুতে? এক কথায় উত্তর–না।

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সংকটগ্রস্ত দেশ ও অঞ্চলেই তাদের এ নিষ্ক্রিয়তা কি বাংলাদেশের মতো অংশে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে? নাকি এটা শুধুই অস্ত্র বিক্রি ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ছায়াযুদ্ধের নামান্তর? ফলে এ ধরনের একটি জোট হলেই তা মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং আত্মরক্ষার মতো গুরুতর প্রশ্নে জানবাজি দিয়ে মাঠে নামবে–তা বিশ্বাস করাটা ভীষণ কঠিন।

 

বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রশ্নের কথা। রোহিঙ্গা সংকট নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের জন্য এক বড় সংকট। যথাযথভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সহায়তাও জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন আসে যে, যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে হাজারবার দেনদরবারের পরও এই শিকে তো এখনো ছেঁড়েনি।

রোহিঙ্গা সংকটটি বাংলাদেশের জন্য এমন এক সংকট, যা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া হলেও অন্য শক্তিগুলোর জন্য এটি সওদা করার মাধ্যম। সংকট সমাধানের আশ্বাস কোনো কাজে প্রলুব্ধ করতে যেমন কাজে লাগছে, তেমনি অনুদান বন্ধ বা সহায়তা ছাড়ে বিলম্ব বা নিদেনপক্ষে নিস্পৃহতা বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে অনেক বছর ধরেই কাজে আসছে। এই চমৎকার বটিকা সহজে কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না।

এবার সবচেয়ে বাজে অনুমানের দিকে যাওয়া যাক। এরই মধ্যে জয়সওয়াল জানিয়েছেন, বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। আর এর দিকে ইঙ্গিত করে আগেই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে রেখেছেন–এটা মুসলিমদের বিষয়। এখানে অন্যদের না ভাবলেও চলবে।

বোঝাই যাচ্ছে, ভারত এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়াটা ঠিক পছন্দ করবে না। বিশেষত পাকিস্তানের পাশাপাশি সৌদি ও তুরস্ক এই অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি নিয়ে কোনো একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রবেশাধিকার পাক, তা নয়াদিল্লি চাওয়ার কোনো কারণ নেই। এটুকু শুনে বলা যেতেই পারে যে, তাহলে তো ভালো। ভারতকে চাপে রাখা গেল। হ্যাঁ চাপে থাকবে। কিন্তু সে তো সামরিক বিবেচনায়। অভিন্ন নদী, সীমান্ত সংকট, পুশ-ইন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যসহ অন্য নানা ক্ষেত্র–সেগুলোর ক্ষেত্রে কী ঘটবে। নদীর পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে যেমনটা এখন চীনকে সঙ্গে নিয়ে করা যাচ্ছে, এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার পর চীনের স্বার্থে তা আঘাত করলে তেমনটা কি আর করা যাবে?

এবার সবচেয়ে বাজে দৃশ্যের কথা ভাবুন। ১৯৬৫ সালের মতো ভারত ও পাকিস্তানের মতো কোনো যুদ্ধ বেধে গেল, যা তাদের সীমান্ত বিরোধ থেকে মাঝেমাঝেই হয়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চুক্তিভুক্ত দেশ হিসেবে যুক্ত হলো। তখন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশের ব্যবহৃত হওয়ার শঙ্কাও কি বেড়ে যাবে না? আর ১৯৬৫ সালের অভিজ্ঞতা বলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার কথা বিন্দুমাত্র মাথায় ছিল না সে সময়ের পশ্চিম পাকিস্তানের। সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে দেওয়া হয় পূর্বাঞ্চলকে, যা এখন বাংলাদেশ, আর যা পাকিস্তানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেই স্বাধীন হয়েছে, যেখানে হওয়া জেনোসাইডের বিষয়ে পাকিস্তান আজ অবধি ক্ষমা বা আনুষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ পর্যন্ত করেনি।

সবচেয়ে বড় কথা হলো–এমন একটি জোট হচ্ছে সেই সময়ে, যখন ইরানের সঙ্গে একটা যুদ্ধ চলমান, যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত। ফলে এই চুক্তি ইরানকে কেন্দ্রে রেখে মুসলিম বিশ্বের গোটা সমীকরণের বিপরীতে। এ ক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া, ইরান, ভারত এক বর্গে পড়বার বা একটি পক্ষে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তেমনটি হলে বাংলাদেশ না ঘরকা, না ঘাটকা অবস্থায় পড়বে নাকি?

ফলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী ‘মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগের সম্পর্ক’ আমলে নিয়ে আবেগী হয়ে এ ধরনের চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখা জরুরি যে, মক্কা নিয়ে মুসলিম আবেগটি ধর্ম সম্পর্কিত, আর মক্কা চুক্তিটি দেওয়া-নেওয়া এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ভূরাজনীতিকে আমলে নিতে হয়, আবেগ নয়। বাংলাদেশের যে নন অ্যালাইনড পররাষ্ট্রনীতি, তাই এতদিন ঢাকাকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নানা পক্ষের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাওয়ার রসদটি দিয়েছে। কোনো একদিকে হেলে পড়লে এই সক্ষমতা কমবে বই বাড়বে না। ফলে সুরক্ষার বটিকা নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার যে শঙ্কা, তা কিন্তু প্রবল।

ফজলুল কবির: বার্তা সম্পাদক, চরচা