Image description

চীনের বাজারে বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল রপ্তানির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিলেছে। তবে চীন জুড়ে দিয়েছে নানা শর্ত। সেগুলো পূরণ করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের শর্ত অনুযায়ী, শুধু ভালো মানের কাঁঠাল উৎপাদন করলেই হবে না, বাগান নির্বাচন থেকে শুরু করে ফলের ব্যাগিং, কীটপতঙ্গ দমন, কীটনাশক ব্যবহারের হিসাব সংরক্ষণ, প্যাকিং, লেবেলিং, ফাইটোস্যানিটারি পরীক্ষা এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, চীনের বাজারে কাঁঠাল পাঠানোর সক্ষমতা এখন নির্ভর করবে বাংলাদেশের কৃষক ও রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর।

বাংলাদেশ গত বছর চীনে কাঁচা আম রপ্তানি শুরু করে। তখনই কাঁঠাল ও পেয়ারা আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস (জিএসিসি) গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ থেকে তাজা কাঁঠাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছিল।

শুধু কাঁঠাল উৎপাদন করলেই হবে না
কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম ভারত। এর পরের অবস্থান বাংলাদেশের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতিবছর ২০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ টন কাঁঠাল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ছয় হাজার ১৩১ টন বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত ২৬ হাজার ৬৬০ টন কাঁঠাল রপ্তানি করেছে। একই অর্থবছরে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র দুই হাজার ৮১ টন কাঁঠাল। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ডে কাঁঠাল রপ্তানি করে থাকে বাংলাদেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বাগান সবখানেই কাঁঠালের উৎপাদন হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য যে ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও নথিভুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা প্রয়োজন, তাতে বাংলাদেশের বড় ঘাটতি রয়েছে। দেশে কাঁঠালের বড় অংশ উৎপাদিত হয় প্রচলিত পদ্ধতিতে। অনেক বাগানে কোন কীটনাশক কখন, কী মাত্রায় ব্যবহার করা হয়, তার লিখিত রেকর্ড থাকে না। কোন গাছের ফল কোন বাগান থেকে এসেছে, কখন সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কোন প্যাকিং হাউসে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে– এ ধরনের তথ্যও নিয়মিত সংরক্ষণ করা হয় না।

কিন্তু চীনের জুড়ে দেওয়া শর্তে এসব তথ্যই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রপ্তানিকারক বাগান ও প্যাকিং হাউসকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে যাচাই ও নিবন্ধিত হতে হবে। এর পর সেই তালিকা চীনের জিএসিসি অনুমোদন করবে। অর্থাৎ, ইচ্ছা করলেই কোনো বাগান থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে চীনে পাঠানোর সুযোগ থাকবে না।

চীন রপ্তানির জন্য অনুমোদিত বাগানে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস বা গ্যাপ অনুসরণের শর্ত দিয়েছে। নিরাপদ ও মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে বাগানে নির্দিষ্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ কাঁঠাল বাগান এখনও গ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসেনি। অনেক কৃষক ফল উৎপাদনে পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য যে ধরনের উৎপাদন নথি, বালাই ব্যবস্থাপনা, ফল সংগ্রহ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা দরকার,  তা তাদের অনেকের কাছেই নতুন।

চীনের শর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, কীটনাশক ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করা। বাগানে কোন তারিখে, কী ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে, ওষুধের নাম কী, সক্রিয় উপাদান কী এবং কী মাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে– এসব তথ্য অন্তত দুই বছর সংরক্ষণ করতে হবে। চীনের কাস্টমস চাইলে এসব রেকর্ড দেখাতে হবে।

চীনের শর্তে কাঁঠালের ব্যাগিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কচি অবস্থায় ফলকে বিশেষ ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। যাতে ফলমাছি, মিলিবাগ, স্কেল পোকাসহ ক্ষতিকর পোকামাকড় ফলের সংস্পর্শে আসতে না পারে।

প্যাকিং হাউসের সক্ষমতাও সীমিত
চীনের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী কাঁঠাল সংগ্রহের পর ধোয়া, গ্রেডিং, পরিষ্কার, বাছাই ও প্যাকেজিং নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে করতে হবে। ফলের গায়ে থাকা মাটি, পোকামাকড়, পচা অংশ কিংবা উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্যাকিং হাউস। শুধু ফল সংগ্রহ করে কার্টনে ভরে দিলেই হবে না, সেখানে পোকামাকড় প্রতিরোধী স্ক্রিন বা নেট, বাছাইয়ের ব্যবস্থা, ফল পরিষ্কারের ব্যবস্থা এবং চালানভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণের সুযোগ থাকতে হবে। বাংলাদেশে ফল রপ্তানির জন্য কিছু প্যাকিং অবকাঠামো তৈরি হলেও কাঁঠালের মতো বড় ও ভারী ফলের জন্য পর্যাপ্ত বিশেষায়িত প্যাকিং ব্যবস্থা এখনও সীমিত। 

চীনের শর্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রেসেবিলিটি। একটি কার্টনে থাকা কাঁঠাল কোন বাগান থেকে এসেছে, কোন প্যাকিং হাউসে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, কখন প্যাক করা হয়েছে– এসব তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো চালানে সমস্যা দেখা দিলে চীনা কর্তৃপক্ষ যেন উৎস বাগান পর্যন্ত ফিরে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে।

চীনে পাঠানো কাঁঠালের প্যাকেজিং সামগ্রী নতুন, পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ সুরক্ষা কনভেনশনের (আইপিপিসি) মান আইএসপিএম১৫ অনুসরণ করতে হবে। প্রতিটি বাক্সে পণ্যের নাম, বাংলাদেশ, জেলা বা অঞ্চল, বাগান এবং প্যাকিং হাউসের নাম বা নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। 

রপ্তানির আগে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়কে ফাইটোস্যানিটারি পরীক্ষা করতে হবে। ক্ষতিকর পোকা, মাটি বা চীনের জন্য নিষিদ্ধ জীবাণু পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চালান রপ্তানি করা যাবে না। চীনের বন্দরে পৌঁছানোর পরও চালানের সনদ, আমদানি অনুমতি ও বাক্সের লেবেল পরীক্ষা করা হবে। অনিবন্ধিত বাগান বা প্যাকিং হাউস থেকে ফল এলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। কোনো ক্ষতিকর পোকা বা নিষিদ্ধ জীবাণু পাওয়া গেলে পুরো চালান ফেরত পাঠানো, ধ্বংস অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করার মতো ব্যবস্থা নিতে পারে চীনা কর্তৃপক্ষ। কোনো রপ্তানিকারকের চালানে বারবার সমস্যা হলে ভবিষ্যৎ রপ্তানিও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, সরকার চাইলে নির্দিষ্ট অঞ্চল ও বাগানকে নিয়ে পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য কাঁঠালের একটি আলাদা উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। প্রথম দিকে সীমিত সংখ্যক বাগানকে নিবন্ধনের আওতায় এনে সেগুলোকে গ্যাপ অনুসারে পরিচালনা করা হলে ধীরে ধীরে পরিধি বাড়ানো সম্ভব। কৃষক ও বাগান মালিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃষি কর্মকর্তাদেরও চীনের নির্ধারিত কোয়ারেন্টাইন শর্ত সম্পর্কে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

অধ্যাপক আবু নোমান আরও বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে হাজার হাজার ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদনকে একটি রপ্তানি ব্যবস্থার মধ্যে এনে প্রতিটি ফলের উৎস শনাক্তযোগ্য করা সহজ কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে বড় কৃষক, রপ্তানিকারক ও চুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট রপ্তানিকারক নির্দিষ্ট নিবন্ধিত বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করবেন। প্রতিটি বাগানকে একটি নিবন্ধন নম্বর দেওয়া হবে। এর পর বাগান থেকে প্যাকিং হাউস এবং প্যাকিং হাউস থেকে রপ্তানি চালান পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উৎপাদনব্যবস্থা বদলাতে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে। ফলের ব্যাগ, শ্রম, বাগান ব্যবস্থাপনা, রেকর্ড সংরক্ষণ, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার, ফল বাছাই ও মানসম্মত সংগ্রহসহ সবকিছুর সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে। সরকারকে শুরুতেই হিসাব করতে হবে, চীনের মানদণ্ড মেনে এক কেজি কাঁঠাল উৎপাদন ও প্যাকিংয়ে বাড়তি কত খরচ হবে এবং বাজারে তার কতটা মূল্য পাওয়া সম্ভব।

জাহাঙ্গীল আলম আরও বলেন, দেশের সম্ভাবনাময় কাঁঠাল উৎপাদন এলাকাগুলো চিহ্নিত করে রপ্তানিযোগ্য বাগানের তালিকা তৈরি করতে হবে। এসব বাগানে গ্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে চীনের জন্য কাঁঠালের মান নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশ চাইলে একটি বৃহত্তর রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে একই ব্যবস্থার আওতায় কাঁঠালের পাশাপাশি পেয়ারা, আমসহ অন্যান্য ফলও বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর সুযোগ বাড়বে।

কৃষি সচিব  ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির অনুমোদন দেশের কৃষিপণ্যের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বেসরকারি খাত ও কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হবে। প্রথম দিকে নির্দিষ্ট কিছু বাগান ও উৎপাদন এলাকা নির্বাচন করা হতে পারে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া, রপ্তানিযোগ্য বাগান নিবন্ধন করা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা হবে।