অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম বলছে, ব্যবসায়ীরা যখন ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেন, তখন ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ বা তারল্য কমে যায়। আবার ঋণের চাহিদা কমে গেলে ব্যাংকের হাতে অর্থ জমতে থাকে এবং তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন না, বিনিয়োগ কমে গেছে, শিল্প সম্প্রসারণ কার্যত স্থবির। স্বাভাবিকভাবে এতে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক এখনও তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক ব্যাংককে।
পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে শুধু ইসলামী ব্যাংককেই সাম্প্রতিক সময়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। আর গত দেড় বছরে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট তারল্য সহায়তার পরিমাণ ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ব্যবসায়ীরা যখন ঋণই নিচ্ছেন না, তখন ব্যাংকে টাকা নেই কেন?
স্বাভাবিক অর্থনীতির হিসাব মিলছে না
সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী ব্যাংকের তারল্য নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপরে—আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণের ওপর। যদি আমানত বাড়ে এবং নতুন ঋণ কম বিতরণ হয়, তাহলে ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়ার কথা। বর্তমানে বাংলাদেশে ঠিক এমন পরিস্থিতিই বিরাজ করছে। ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। একইসঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
কিন্তু তারপরও কয়েকটি ব্যাংকে প্রতিদিন গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল সাময়িক তারল্য সংকট নয়, বরং বহু বছরের আর্থিক অনিয়মের বহিঃপ্রকাশ।
সমস্যা শুরু বহু বছর আগে
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, একই গ্রুপকে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ, দুর্বল জামানত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিল তদারকির কারণে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান দ্রুত অবনতি ঘটে।
বিশেষ করে সরকারের শেষ দুই বছরে অনেক ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে, অথবা এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যেগুলো থেকে ঋণ আর ফেরত আসেনি। ফলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে ঋণ সম্পদ হিসেবে থাকলেও বাস্তবে সেই অর্থ আর ব্যাংকে ফিরে আসেনি। আজকের তারল্য সংকটের মূল কারণ এখানেই।
ঋণ কমলেও নগদ অর্থ ফিরছে না
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান সংকটকে শুধু নতুন ঋণের চাহিদা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ নতুন ঋণ কমলেও পুরোনো বিপুল পরিমাণ ঋণ ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অনেক ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, আবার অনেক ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের কাগজে সম্পদ থাকলেও হাতে নগদ অর্থ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এ অবস্থায় নতুন ঋণ না দিলেও পুরোনো ঋণ ফেরত না আসায় ব্যাংকের নগদ অর্থের সংকট কাটছে না।
ইসলামী ব্যাংকগুলো কেন বেশি সংকটে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট বলছে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কিছু ব্যাংকের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ১২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ তারা যত আমানত সংগ্রহ করেছে, তার চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। ফলে আমানতকারীরা একসঙ্গে টাকা তুলতে এলে ব্যাংকের পক্ষে সেই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ তারল্য সহায়তা, রেপো সুবিধা, আন্তব্যাংক সহায়তা এবং জরুরি অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে হচ্ছে।
৭৬ হাজার কোটি টাকার সহায়তাও কেন যথেষ্ট নয়?
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকার বেশি জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন ব্যাংকে অতিরিক্ত সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ মূলত গ্রাহকদের দৈনন্দিন অর্থ উত্তোলন নিশ্চিত করার জন্য। এটি কোনও ব্যাংকের মূল সমস্যা সমাধান করে না।
কারণ সমস্যার শিকড় রয়েছে—দীর্ঘদিনের ঋণ জালিয়াতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ, বিদেশে অর্থপাচার, মূলধন ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে সংকট দীর্ঘমেয়াদে কাটানো সম্ভব নয়।
ঋণ নিচ্ছেন না কেন উদ্যোক্তারা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ, ডলারের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার অভাব—সব মিলিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনে কেউ বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
অনেক উদ্যোক্তার ভাষায়, শুধু ঋণ পাওয়াই এখন সমস্যা নয়; উৎপাদন চালানোর নিশ্চয়তাই নেই। গ্যাস না থাকলে বা বিদ্যুৎ না পেলে নতুন ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন করে লাভ কী?
অন্যদিকে আমানত বাড়ছে
বিরোধপূর্ণ হলেও বাস্তবতা হলো, ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে শুরু করেছে। রেমিট্যান্সও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। ডলারের বাজারেও তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এসেছে।
কিন্তু এই আমানতের বড় অংশ যাচ্ছে তুলনামূলক শক্তিশালী ও সুশাসনসম্পন্ন ব্যাংকে। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে নতুন আমানত কম আসছে, বরং পুরোনো আমানত তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা। ফলে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
সংস্কার শুরু হলেও পথ দীর্ঘ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করে। পরে বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ব্যাংক রেজুলেশন আইন, খেলাপি ঋণ আদায়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও দীর্ঘদিনের অনিয়ম এক-দুই বছরে দূর করা সম্ভব নয়।
আস্থা ফিরবে কবে?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট শুধু তারল্যের সংকট নয়; এটি আস্থার সংকটও। একদিকে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন। অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহকরা নিজেদের আমানত নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ফলে নতুন ঋণও বাড়ছে না, আবার পুরোনো ঋণের অর্থও ফিরছে না। ফলাফল হচ্ছে, ব্যাংকগুলো একইসঙ্গে ঋণ সংকোচন, তারল্য সংকট এবং মূলধন ঘাটতির ত্রিমুখী চাপে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মত
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সুদের হার কমানো বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে না। সবচেয়ে জরুরি হলো খেলাপি ঋণ আদায়, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তাদের ভাষায়, ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, তবু ব্যাংকে টাকা নেই—এটি বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। এই বৈপরীত্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও সুশাসনের ঘাটতি। তাই কেবল তারল্য সহায়তা নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা শুধু ব্যাংকিং খাতের একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। সাধারণভাবে ব্যবসায়ীরা ঋণ কম নিলে ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, অনেক ব্যাংক এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো, সমস্যা নতুন ঋণ বিতরণে নয়; বরং অতীতে বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায় না হওয়া, খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের সুশাসনের ঘাটতিতে।’’
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে পোশাক খাতসহ উৎপাদনমুখী শিল্পের অনেক উদ্যোক্তা নতুন ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, উচ্চ সুদের ব্যয়, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরে না এলে শুধু নীতিসুদ কমিয়ে বা প্রণোদনা ঘোষণা করে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব হবে না।’’
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘‘ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম ইতিবাচক। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর কার্যকর পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়নের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান, রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সবই দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়বে।’’