Image description

গত জুন পর্যন্ত মেয়াদে জারি করা ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির মেয়াদ বাড়ায়নি সরকার। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর, নতুন গাড়ি কেনা, আমলাদের জন্য সুদমুক্ত গাড়ি ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার ওপর থাকা বিধিনিষেধ উঠে যেতে পারে। 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে গত অর্থবছরের শুরুতেই প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এবার এ ধরনের নতুন বিধিনিষেধ জারির সম্ভাবনা কম। জারি হলেও আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে তা শিথিল করা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, গত ৫ এপ্রিল জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপন ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যার মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়েছে। ব্যয় সংযম ব্যবস্থা পুনরায় জারি করার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের
কাছ থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স একটি বড় ক্রয়চুক্তিকেও ব্যয় সংযম নীতির সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

গত বছরের ৮ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকারি খরচে বিদেশে কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে গাড়ি, জাহাজ ও উড়োজাহাজ কেনা বন্ধ রাখা হয়। পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় এবং সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকেও অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল অর্থ বিভাগ ব্যয় সাশ্রয়ী নীতির সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ নীতির আওতায় বিদেশ সফর, সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ এবং যানবাহন, জলযান, উড়োজাহাজ ও জমি কেনার ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে সংশোধিত ব্যয়সংযম ব্যবস্থার আওতায় বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়। কম্পিউটার ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থ ছাড়ও স্থগিত করা হয়। 

২০২০ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক মহামারি করোনা, ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতাসহ দেশে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও ব্যাংকে অর্থ বেহাত হওয়ার মতো ঘটনায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়। এ কারণে কয়েক বছর ব্যয় সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপ নেয় সরকার। 

অর্থ বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সরকারি ব্যয়ও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। 

তারা আরও বলেন, সাশ্রয়ী ব্যয়ের নীতি অনুসরণ করা হলেও পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় খুব বেশি কমানোর সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের গতিও ধীর। এ পরিস্থিতিতে সরকার আপাতত আগের মতো সরকারি ব্যয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপে আগ্রহী নয়। বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। ওই বৈঠক থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চড়া মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে খরা, সরকারি ব্যয়ে ধীরগতি, বিদেশি ঋণে দুরবস্থা আর রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপের মধ্যে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে; যা সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক। এদিকে সরকার ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়ী ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তাদের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য ঘাটতি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে চাপে ফেলতে পারে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট বহিরাগত ধাক্কার ঝুঁকিও এখনও কাটেনি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সমকালকে বলেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ বিবেচনায় এখনই ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি থেকে সরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং এ নীতিকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ব্যয় যথাযথভাবে বাড়ানো গেলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা এর প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে ব্যয় বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয় না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে কিনা, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।