প্রতি চার সেকেন্ডে প্রাণঘাতি তামাক ও তামাকজনিত রোগে অন্তত একজন মানুষ মারা যাচ্ছেন। দিনকে দিন বাড়ছে তামাকের ব্যবহার।
তামাক কোম্পানির নতুন নতুন ফাঁদে আটকা পড়ছে তরুণ প্রজন্ম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের কারণে সারাবিশ্বে অন্তত ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাকখাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
রোববার (৩১ মে) বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি: তামাক ও নিকোটিন আসক্তি প্রতিরোধ করি’ (Unmasking the Appeal: Countering Nicotine and Tobacco Addiction)।
তামাক কোম্পানির নতুন নতুন ফাঁদ
বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় প্রথাগত সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমছে।
২০০০ সালে বিশ্বে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২০ বিলিয়নে।
কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর প্রথাগত সিগেরেট নিয়ে বসে নাই। তারাদের টার্গেট শিশু-কিশোর, নতুন প্রজন্ম। ‘কম ক্ষতিকর’, ‘স্মোক-ফ্রি’ বা ‘ধূমপান ছাড়ার সহায়ক’ এমন মিথ্যা তথ্যের নতুন নতুন ফাঁদে আটকাচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। নতুন নতুন কৌশলে বাজারজাত করছে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে ১৬ হাজারের বেশি সুগন্ধিযুক্ত তামাক ও নিকোটিন পণ্য রয়েছে। বাবলগাম, চকলেট, চেরি, মিন্ট এমন নানা ফ্লেভারে তৈরি পণ্য শিশু-কিশোরদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। অনেক ই-সিগারেট ইউএসবি ড্রাইভ, কলম বা খেলনার আদলে ডিজাইন করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা, রঙিন ডিজাইন, সুগন্ধি ও সেলিব্রেটি মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে তামাক কোম্পানিগুলো।
গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের মধ্যে পরবর্তীতে প্রথাগত সিগারেট ব্যবহারের ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ই-সিগারেটের প্রধান ভোক্তা ১৩-১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা, যাদের বড় অংশ আগে কখনো ধূমপায়ী ছিল না।
টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে এগুলোর প্রচারণা চলছে ব্যাপকভাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এমন দেশগুলোতেও তরুণদের বড় অংশ নিয়মিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-সিগারেটের প্রচারণা দেখে।
নিরাপদ বিকল্প নয় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ই-সিগারেট বা ভেপিংকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে প্রচার করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-সিডিসির গবেষণায় এসব পণ্যের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে।
ই-সিগারেট ব্যবহারের সঙ্গে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, দাঁত ও মাড়ির রোগ, ক্যান্সারের ঝুঁকি, মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা ও শেখার সক্ষমতা হ্রাস এবং উদ্বেগজনিত সমস্যা সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আইনের অগ্রগতি থাকলেও আছে উদ্বেগ
চলতি বছরে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬। এই আইনে, নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ) বাতিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ, বিক্রয়স্থলে তামাকপণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করাসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সংশোধনী প্রক্রিয়ায় ই-সিগারেট, ভেপিং ও নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্য নিষিদ্ধের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং সহজলভ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের তামাক পরিস্থিতি
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩.৭৮ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাকখাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০-১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ২.৪৮ শতাংশ।
নতুন প্রজন্ম রক্ষায় করণীয়
বাংলাদেশে বর্তমান মোট জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশই তরুণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণীকে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকির ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে এবং তামাকমুক্ত সুস্থ প্রজন্ম গড়তে হলে নতুন আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে, ই-সিগারেট ও ভেপিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাকপণ্যের প্রচারণা বন্ধ, এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩ অনুযায়ী তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সকল তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়িয়ে সকল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর শুধু সিগারেট বিক্রি করছে না, পরিকল্পিতভাবে তারা নতুন প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করার জন্য ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্য বাজারজাত করছে। এসব পণ্যকে আধুনিকতা, স্টাইল, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা কিংবা ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলো শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিকোটিন আসক্তির ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ই-সিগারেটের প্রধান ভোক্তা ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা, যাদের বড় একটি অংশ আগে কখনো ধূমপায়ী ছিল না। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের পরবর্তীতে প্রথাগত সিগারেট ব্যবহারের ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়।
অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অত্যন্ত কৌশলে তরুণদের লক্ষ্য করে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো পণ্যের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অথচ ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের সঙ্গে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা, উদ্বেগজনিত সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিকোটিন নির্ভরতার সম্পর্ক ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেটসহ সকল নতুন নিকোটিন ও তামাকপণ্যকে দ্রুত কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, প্রয়োজনে নিষিদ্ধ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের প্রচারণা সম্পূর্ণ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি বলেও মত দেন তিনি।
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, তামাক ও নিকোটিন আসক্তির ফাঁদ থেকে তরুণদের সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।