Image description

বাবা ছিলেন পেসার। খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে। বাবার পথ অনুসরণ করে তিনটি ছেলেও হয়েছেন ক্রিকেটার। বড়জনের ভেতরে অনেক বড় মাপের অলরাউন্ডার হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিলেন অনেকে। ততটা বড় হতে না পারলেও যতটুকু হতে পেরেছেন, সেটি অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। মেজজনের মধ্যে নাকি ফাস্ট বোলিংয়ের আগুন ছিল। খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অনূর্ধ্ব–১৯ দল পর্যন্ত। আর ছোটজন? দক্ষিণ আফ্রিকার পেস কিংবদন্তি।

অনেকেরই জানা, তবু দক্ষিণ আফ্রিকার মরকেল পরিবারকে আরেকবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে সাবেক পেসার আলবার্ট মরকেলের তিন ছেলে। আলবি মরকেল, ম্যালান মরকেল ও মরনে মরকেল। যেহেতু ক্রিকেট খেলুড়ে পরিবার, তাই মারিয়ানা মরকেলের কাছে একটি পরিস্থিতি নিশ্চয়ই অচেনা নয়?

বাড়ির পাশে ছোট্ট মাঠে শৈশবে তিন ভাই যখন টেনিস বল ক্রিকেট খেলেছেন, তখন নিশ্চয়ই বাদানুবাদ হয়েছে? তখন কার পক্ষ নিয়েছেন তাদের মা মারিয়ানা মরকেল?
এই প্রশ্ন উঠছে কারণ, মারিয়ানার সামনে তেমনই এক মুহূর্ত। আহমেদাবাদে আগামীকাল টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে ভারতের মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। এ ম্যাচে থাকবেন মারিয়ানার ছোট ছেলে মরনে মরকেল, যিনি ভারতের বোলিং কোচ। থাকবেন বড় ছেলে আলবিও, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট।

ভারতের বোলিং কোচের দায়িত্বে আছেন মরনে মরকেল
ভারতের বোলিং কোচের দায়িত্বে আছেন মরনে মরকেলমরনে মরকেলের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

শৈশবে ছেলেপুলেদের সেসব খুনসুটির দিন পেরিয়ে মারিয়ানার জীবনে একটা সময় এসেছিল, যখন দুই ছেলেকে সতীর্থ হিসেবে খেলতে দেখেছেন দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলে; কিন্তু এখন কি করবেন মা? ভারতের ‘নীল’ শিবির, না দক্ষিণ আফ্রিকার ‘সবুজ’—কোন দল বেছে নেবেন? মারিয়ানা বলতে পারেন, বেছে নিতে হবে কেন! তিনি দুই ছেলের পক্ষেই আছেন।

কিন্তু খেলাধুলায় সেটি অসম্ভব। একসঙ্গে দুই দলের পক্ষে থাকা যায় না, তাতে হোক না এক শিবিরে তাঁর বড় ছেলে ও অন্য শিবিরে ছোট ছেলে। হ্যাঁ, স্নেহের বশে দুই সন্তানেরই হয়তো মঙ্গল চাওয়া যায়; কিন্তু একজনকে তো হারতে হবেই। মারিয়ানার জন্য ব্যাপারটা কিন্তু আসলেও বেশ মানসিক চাপের।

আলবি তাই বেশ মজা পাচ্ছেন। তাঁরা দুই ভাই পড়ে আছেন নিজ নিজ দলের ম্যাচ নিয়ে, ওদিকে চাপটা টের পাচ্ছেন তাঁদের মা। সেটিই হালকা রসিকতার মেজাজে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বুঝিয়ে দিলেন আলবি। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে দুই ভাই একে অপরের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করবেন কি না? এই প্রশ্নের উত্তরে মায়ের প্রসঙ্গও টানলেন আলবি, ‘না, আমাদের মধ্যে কথা হয় না। আমাদের মা সম্ভবত আমাদের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তিনি জানেন না কাকে সমর্থন করবেন, ভারত না দক্ষিণ আফ্রিকা?’

৪৪ বছর বয়সী আলবি একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা বলের ক্রিকেটে ছিলেন নিয়মিত মুখ। তাঁকে ল্যান্স ক্লুজনারের উত্তরসূরিও ভাবা হয়েছে। ৫৮ ওয়ানডে, ৫০ টি–টুয়েন্টি ও ১টি টেস্ট ম্যাচের ক্যারিয়ার। খুব ভালো করতে পারেননি তবে বিগ হিটিংয়ের সুনাম ছিল। ১.৯৬ মিটার লম্বা মরনে ছিলেন ক্ল্যাসিক ‘হিট দ্য ডেক’ ফাস্ট বোলার। ১১৭ ওয়ানডে ও ৪৪ টি–টুয়েন্টি খেললেও টেস্ট ক্যারিয়ারই বেশি আলোচিত। ৮৬ টেস্টে নিয়েছেন ৩০৯ উইকেট।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যান ডেভাল্ড ব্রেভিসের সঙ্গে আলবি মরকেল
দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যান ডেভাল্ড ব্রেভিসের সঙ্গে আলবি মরকেলআইসিসি

টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দুই ভাই এর আগেও কোচিং স্টাফে ছিলেন। সেটি একই দলে। ২০২২ আসরে নামিবিয়ার সহকারী কোচ ছিলেন আলবি আর বোলারদের সঙ্গে কাজ করেছেন মরনে। এরপর দুই ভাইয়ের পথ আলাদা হয়।

আইপিএলে লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের কোচের দায়িত্ব পালনের পর পাকিস্তানের বোলিং কোচ হন মরনে। ২০২৪ সালে ভারতের বোলিং কোচের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাঁকে এ ভূমিকাতেই দেখা যাচ্ছে। আলবি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আইপিএলের দল চেন্নাই সুপার কিংসের কোচিং স্টাফে। এসএ২০ এর দল জোবার্গ সুপার কিংসের কোচিং স্টাফে ছিলেন। নিউজিল্যান্ড কিংবদন্তি ও চেন্নাইয়ের প্রধান কোচ স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের কোচিং দর্শনের সরাসরি প্রভাব আছে আলবির ওপর।

তবে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে তেমন একটা যোগাযোগ হয়নি। মরনে নিজেই জানিয়েছেন সে কথা, ‘তাকে মাঠে দেখেছি। খুব একটা কথা হয়নি। তবে তাকে দেখে ভালো লাগছে।’

‘স্পেশালিস্ট কনসালট্যান্ট’—দক্ষিণ আফ্রিকা দলে আলবির এই দায়িত্ব আসলে কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে আলবি নিজেও পরিস্কার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না, ‘বেশ আকর্ষণীয় নাম—স্পেশালিস্ট কনসালট্যান্ট। বিষয়টি আমার নিজেকেই আগে একটু বুঝে নিতে হয়েছে। বিশ্বকাপে দলকে ভালো করাতে যেকোনো কাজই করতে হয়। ব্যাটিং ও ফিল্ডিং—দুটি নিয়েই কাজ করেছি, আপাতত বেশি মনোযোগ ছিল বোলিংয়ে। এ ছাড়া লোয়ার অর্ডারের ব্যাটিং ও সুইং নিয়েও কাজ করি।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভাইদের গল্প কম নেই। চ্যাপেল, ওয়াহ, অমরনাথ, মোহাম্মদ কিংবা হ্যাডলি ভাইদের কথাও বলা যায়; কিন্তু তাঁরা সবাই একই ড্রেসিংরুমের। কারেন ভাইয়েরা একটু ব্যতিক্রম। স্যাম কারেন ইংল্যান্ডের হয়ে খেললেও বেন কারেন খেলেন জিম্বাবুয়ের হয়ে। মরকেল ভাইয়েরা এখানে আরও আলাদা। সতীর্থ হিসেবে জাতীয় দলে খেললেও কোচ হওয়ার পর জীবন তাঁদের এখন মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।