Image description

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দে আপত্তি জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, ভাষা দিবসে শুধু প্রোগ্রাম করলাম, কালচারাল প্রোগ্রাম করলাম, এটা করলে চলবে না। এটা নিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলাকে যদি আমার মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না।

ইনকিলাব ডোন্ট মাই ল্যাঙ্গুয়েজ। ইনকিলাব মঞ্চ হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নেই। আমি যে এসব কথাবার্তা বললাম, দেখা যাবে ব্যান করে ফেলবে আমাকে। বলবে ভারতের দালাল, অনেক কিছু বলতে পারে। বাট আমি বলব। কারণ, এটা বলার জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। মরে গেলে আজ কেউ নাম নেবে না। বেঁচে আছি বলেই আজ মন্ত্রী হয়েছি। এই ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে বলেই আমি মন্ত্রী হয়েছি। দেশকে ভালোবাসতে হলে পরিশুদ্ধ করতে হবে। তাহলেই বাংলা ভাষা রক্ষা করা হবে।

গতকাল শনিবার সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আরো বলেন, বাংলা ভাষার যে ইতিহাস, অনেক কম ভাষারই এমন ইতিহাস আছে। এজন্য আমি বলতে চাই, নিজেকে ভালোবাস, নিজের দেশকে ভালোবাস; নিজের যাÑসেটাকে ভালোবাস। নিজের ভাষা-সংস্কৃতি সব আমাদের করতে হবে। নিজের ভাষাটাকে আমরা ঠিকমতো জানার চেষ্টা করিনি বলেই আমাদের ন্যাশনালি গ্রো করা। আজ বাংলা ভাষাকে নিয়ে আমরা যদি একটু চিন্তা করতাম! আজকালের ছেলেমেয়েরা ইনকিলাব বলে। ইনকিলাব তো অন্যদিকের ভাষা, যারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও ইনকিলাব, ফায়সালা, জিন্দাবাদ, ইনসাফ, আজাদি শব্দগুলোকে বাংলা ভাষায় ব্যবহার করার বিষয়ে প্রবল আপত্তি জানান। তার এ বক্তব্যের পর ক্ষোভ জানিয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও দৈনিক ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ইনসাফ, ইনকিলাব, ফায়সালা, আজাদি, জিন্দাবাদ এবং আওয়ামী লীগ, এমনকি চু… লিংপংও সুন্দর বাংলা শব্দ।

বিদ্যুৎমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির যু্গ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার লিখেছেন, নতুন ভাষাপণ্ডিতদের কাছে জানতে পারলাম ইনসাফ, জুলুম, মজলুম ইত্যাদি শব্দ নাকি বলা যাবে না! এগুলো নাকি বাংলা ভাষার শব্দ নয়! খোদা তুমি একটু রহম কর! অজ্ঞতার এই দাম্ভিক প্রদর্শনী থেকে তুমি আমাদের মুক্তি দাও। এদের এই লজিকে শহীদ আর মিনার এগুলোও ‘বিদেশি’ শব্দ! ভাসানীকে এখন আর মজলুম জননেতা বলা যাবে না, নিপীড়িত জননেতা বলতে হবে!

তিনি বলেন, ভাষার রূপতত্ত্ব ও শব্দতত্ত্ব অনুযায়ী ‘বিদেশি শব্দ’ বলতে কিছু নেই। যেগুলো বিদেশি শব্দ, সেগুলো বিদেশিই, তার আলাদা বাংলা অর্থ আছে। যেমনÑরেসিডেন্সের অর্থ আবাস/নিবাস।

কিন্তু যে শব্দ নিজে থেকেই একটা অর্থ দেয়, তাকে আর ‘বিদেশি’ শব্দ বলার জো নেই। যেমনÑচেয়ার, টেবিল, টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি শব্দ এখন বাংলা শব্দ। ইন্টারনেটকে ‘অন্তর্জাল’ বলা অর্থহীন। ইন্টারনেট বললে বুঝি কী বলা হচ্ছে, অন্তর্জাল বললে অর্থ খুঁজতে হয়।

‘ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক’ শিরোনামে তুষার আরো লিখেছেন, পর্তুগিজ, ডাচ, ফারসি বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় শব্দ এসেছে। সেগুলো এখন বাংলা ভাষার শব্দই। বালতি বা আলপিন বা আনারসকে ‘বিদেশি’ শব্দ বলা আহাম্মকি ছাড়া কিছু হবে না।

‘বিদেশি’ শব্দ কথাটা সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হয় উর্দু-ফারসিজাত শব্দের ক্ষেত্রে। এর পেছনে যে ইসলামবিদ্বেষ ক্রিয়াশীল, তা সহজেই নজরে পড়ে। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা হজম করা শক্ত। অন্যান্য উৎস থেকে যে শব্দগুলো বাংলা ভাষার আপন শব্দ হয়ে উঠেছে, আপত্তি সেগুলো নিয়ে নয়।

এ কারণে আজকে একজন মন্ত্রী বলতে পারবেন ইনকিলাব আমাদের শব্দ নয়, ইট ইজ অ্যা ফেইলিওর অব আওয়ার টিচার। অর্থাৎ, ‘ইনকিলাব’ হটাতে ইংরেজির দ্বারস্থ হওয়া যাবে, তবু ইনকিলাব মেনে নেওয়া যাবে না! মন্ত্রী সাহেব হয়তো ভুলে গেছেন ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতেই উপমহাদেশের বিপ্লবীরা প্রথম ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

এক লোক একবার ‘দাওয়াত’ শব্দ নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এহেন ‘বিদেশি’ শব্দ চান না, তাকে আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ জানাতে হবে! তো সবাইকে দাওয়াত দিয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এই ‘প্রগতিশীল’ ও অজ্ঞ সাম্প্রদায়িকতা লইয়া আমরা কী করিব?

আজকে দেখলাম ঢাবির বাংলার এক অধ্যাপক ‘ফয়সালা’ শব্দটাও নিতে পারছেন না! মীমাংসা নাকি বলতে হবে! মীমাংসা বললে নাকি খাঁটি বাংলাপ্রেম হয়! তা অধ্যাপক সাহেব, আপনার এই মীমাংসা শব্দও তো সংস্কৃতজাত। ভারতীয় দর্শনশাস্ত্র ও বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান এবং বেদের প্রামাণ্য ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা হলো ‘মীমাংসা’। মীমাংসাকে তো আমরা আপন করে বাংলা ভাষার করে নিয়েছি, ফয়সালাকে আপনি আপন করবেন কবে অধ্যাপক সাহেব?

দেশি শব্দ, বিদেশি শব্দের মতো ভাষাতত্ত্বের মীমাংসিত বিষয় নিয়ে আবার কি নতুন করে ফয়সালা করতে হবে, স্যার?