আসন্ন আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মাঠে গড়াতে আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। তবে বৈশ্বিক এই মহারণে বাংলাদেশের খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। বিশ্বকাপে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ খেলার কথা টাইগারদের। কিন্তু নিরাপত্তার ইস্যুতে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে নারাজ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের সরকারি পর্যায়েও এ নিয়ে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এমন সিদ্ধান্তে কলকাতার ক্রিকেট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।
সেখানকার প্রাক্তন ক্রিকেটার, জাতীয় নির্বাচক থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীরা বলছেন, মোস্তাফিজুর রহমান ইস্যুতে বিশ্বকাপে খেলতে না আসা বা মাঠের ক্রিকেটে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। যদিও অনেকে এও বলছেন, রাজনীতি আর কূটনীতি সব খেলাকেই প্রভাবিত করে, তাই ক্রিকেট মাঠ তার থেকে আলাদা কীভাবে থাকবে?
এদিকে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে সমর্থকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটাও অবান্তর বলছেন কেউ কেউ। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে মেডিকেল ভিসা ছাড়া কোনো ভিসাই বাংলাদেশিদের দিচ্ছে না ভারত। সেক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি ভক্তদের দেখতে পাওয়ার প্রশ্নও থাকছে না।
ক্রিকেট মাঠে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অবাঞ্ছনীয় ছিল বলে গণমাধ্যমে বলছেন ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন নির্বাচক সম্বরণ ব্যানার্জী। তার ভাষ্যমতে, "বাংলাদেশে যা ঘটে চলেছে, হিন্দুদের ওপরে নিয়মিত নির্যাতন হচ্ছে, সেদিক থেকে দেখতে গেলে হয়ত মোস্তাফিজুরকে খেলতে না দেওয়াটা ঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সে নেওয়ার আগে সেটা জানালে ভালো হত। তবে আমার মতে খেলার মাঠে রাজনীতি আসাটা অনুচিত। কোনো প্লেয়ারকেই বঞ্চিত করাটা উচিত নয়। আমাদের কাছে খেলাটাই তো সব–খেলতে বাধা দেওয়া ঠিক না।"
অন্যদিকে কলকাতার 'এই সময়' পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক ও কলকাতা স্পোটর্স জার্নালিস্টস ক্লাবের সচিব অর্ঘ্য ব্যানার্জী বলছিলেন, "নিলামের আগেই যদি বিসিসিআই ঘোষণা করত যে বাংলাদেশি প্লেয়ারদের খেলানো যাবে না, তাহলে তো ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না। আগেই সামলিয়ে নেওয়া যেত। যে-রকম পাকিস্তানের প্লেয়ারদের খেলতে দেয় না, সেরকম বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ব্যাপারে আগেভাগেই জানাতে পারত বিসিসিআই।"
কলকাতার ক্রিকেট ভক্তদের একাংশেরও মোস্তাফিজকে খেলতে না দেওয়া নিয়ে অনেকটা একই মত। টেলিকম শিল্পের একজন বিশেষজ্ঞ ও ক্রিকেট ফ্যান অমিতাভ বিশ্বাসের ভাষ্যমতে, "মোস্তাফিজের ব্যাপারে বিসিসিআই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা তো আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। এটা অনুচিত হয়েছে। বিসিসিআই তো আগে ঠিক করতে পারত যে পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশের কোনো প্লেয়ারকে নিলামে তোলা যাবে না! তবে বাংলাদেশও ভুল করতে যাচ্ছে–একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের সঙ্গে আইসিসি টুর্নামেন্ট গুলিয়ে ফেলছে তারা। এতে দীর্ঘমেয়াদে কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরই ক্ষতি হবে। কারণ, এ রকম একটা টুর্নামেন্টে যে এক্পোজার পাওয়া যায়, সেটা থেকে বঞ্চিত হয় ওরা।"
এদিকে কলকাতার বিশ্লেষক ও ক্রিকেট মহলের দাবি, অতীতে ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ নিয়ে এমন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এখন বাংলাদেশের সঙ্গেও একই পরিস্থিতি হবে ভারতের।
সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক জয়ন্ত চক্রবর্তীর ভাষ্য, "আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা, শোয়েব আখতার একবার কলকাতায় খেলতে আসার সময়ে সৌরভ গাঙ্গুলির জন্য কাবুলি চপ্পল উপহার নিয়ে এসেছিলেন। আবার ১৯৮৬ সালের শারজায় ভারত পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদ ছক্কা মারার পরে কিন্তু আনন্দে দুই দলেরই প্রত্যেকটি প্লেয়ারকে জড়িয়ে ধরেছিলেন তিনি। এখন ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচ হলেও অনেকটা সেরকমই বৈরিতা দেখা যায়। কলকাতা আর ঢাকার মধ্যে একটা রাজনীতির পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়েছে। এটা বাঞ্ছনীয় ছিল না।"
কলকাতার বাসিন্দা সন্দীপ দাসের কথায় "বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তো চাইছে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধিতা আরও ছড়িয়ে দিতে। ভারতে খেলতে না আসার সরকারি সিদ্ধান্তটা নিয়েছে। কারণ, তারা জানে বাংলাদেশের বহু সাধারণ মানুষ এই ভারত-বিরোধী অবস্থানে উচ্ছ্বসিত হবে। কিন্তু শেষমেষ আইসিসি টুর্নামেন্টে না খেললে ক্ষতিটা তো হবে সেদেশের ক্রিকেটের, সঙ্গে আর্থিক জরিমানাও করতে পারে আইসিসি।"
ভারভীয় জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার উৎপল চ্যাটার্জি অবশ্য বলছেন, "অলিম্পিক্স থেকে শুরু করে সব ক্রীড়াঙ্গনেই তো রাজনীতি আর কূটনীতি জড়িয়ে আছে। যখন দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলে, তখন তো রাজনীতি আসবেই। ক্রিকেটের ময়দান তা থেকে বাইরে কী করে থাকবে?"
এদিকে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ কলকাতায় খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্ত ওই তিনটি ম্যাচ সরলেও আরও তিনটি ম্যাচ ইডেন গার্ডেন্সে কথা আছে। এর মধ্যে ইতালির সঙ্গে ইংল্যান্ডের, ইতালি আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের এবং অন্যটি সুপার এইটের। এ নিয়ে উৎপল চ্যাটার্জির দাবি, "এখন তো কলকাতার দর্শকের আর বিশেষ উৎসাহই থাকবে না গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচ দেখার।"
ক্রীড়া সাংবাদিক অর্ঘ্য ব্যানার্জির ভাষ্য, "ইতালি ফুটবলে অন্যতম বিশ্বসেরা, কিন্তু তাদের ক্রিকেট? কে দেখবে? কলকাতায় তো আর তেমন ভালো ম্যাচ পড়েনি। সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এই পরিস্থিতিতে কলকাতার জন্য কিছু একটা নিশ্চয় করতেন তিনি। তবে এখন মনে হয় না ইডেনের নতুন করে অন্য ম্যাচ পাওয়ার সুযোগ আছে। আমার জানা মতে শ্রীলঙ্কাকে অনুরোধ করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি যদি তারা ভারতে এসে খেলে। কিন্তু শ্রীলঙ্কাও তো যৌথ আয়োজক দেশ। তারা নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে খেলতে স্বাভাবিকভাবেই রাজি নয়।"
বাংলাদেশি সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে কলকাতার পেশাজীবী সুজাতা ঘোষ বলছিলেন, "ভারত আর বাংলাদেশের এখন যা সম্পর্ক, তাতে তাদের মনে হতেই পারে যে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দুত্বের কথা বললেও ভারতের কূটনীতি কিন্তু কোনো মুসলিম দেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করেনি। কিন্তু বাংলাদেশ আমাদের ওপরে ভরসা করতে পারল না!"
বাংলাদেশের সমর্থকদের নিরাপত্তা হুমকি 'অবান্তর' উল্লেখ করে জয়ন্ত চক্রবর্তী বলছেন, "একটা সময়ে বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলে সেদেশের সমর্থকরা কলকাতার নিউ-মার্কেট এলাকা, ওখানকার হোটেলগুলো সব ভরিয়ে ফেলতেন। এবারে সেটা আর হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ভারত তো বাংলাদেশিদের মেডিক্যাল আর খুব বিশেষ কারণ ছাড়া ভিসাই দিচ্ছে না।
কলকাতার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী আর ক্রিকেট-ভক্ত তথাগত চ্যাটার্জি বলেন, "দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্যি যে বিশ্ব-রাজনীতিতে সম্পর্কের অবনতির প্রথম আঘাতটা আসে খেলাধুলোর ওপরেই। তবে দুই দেশেই ধর্মীয় উন্মাদনার একটা পরিবেশের কারণে ভারতে খেলতে না আসার যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিল, তাতে কলকাতার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর থেকে কলকাতার নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী বলুন বা হাসপাতাল-শিল্প – সামগ্রিক ভাবে ব্যাবসা-বাণিজ্যে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।"