Image description
 

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। আগামী বছর পর্যন্ত মেয়াদকাল থাকলেও আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েই পদত্যাগ করেছেন তিনি। যদিও একাধিক সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বেতন না হওয়া ছাড়াও ট্রাস্টি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামানকে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মেয়াদকাল ছিল ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। তবে মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগেই গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইউনূস মিয়া।

অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক। এর আগে তিনি ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ফাতিনাজ ফিরোজের মৃত্যু হয়। এরপর তার মেয়ে ড. ফারাহনাজ ফিরোজ ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে উপাচার্যের দূরত্ব তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে থাকা, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় অতিরিক্ত কর্তৃত্ব প্রদর্শন এবং সহযোগিতার ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসে।

ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও করেছি। তারা চায়নি আমি পদত্যাগ করি, বরং আমাকে আটকাতে চেষ্টা করেছে— অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, ‘বেতন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা রয়েছে। চলতি মাসে আমরা নভেম্বরের বেতন পেয়েছি। ট্রাস্টি চাইলে সমস্যার সমাধান করতে পারে।’
 
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়গুলো স্বীকার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের পক্ষ থেকে তাদের ওপর চাপ ছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী যেহেতু তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন, সেহেতু তিনি কেনো পদে থাকবেন।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, না তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী যারা ছাত্র আন্দোলনে জড়িত ছিল, তারা চেয়েছিল তিনি থাকুক।

বেতন-ভাতা আটকে থাকা ও ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত কতৃত্ব প্রদর্শন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেতন সমস্যাটা আমাদের পুরোনো। সাধারণত এক মাস করে বেতন বকেয়া থাকে। বর্তমানে নভেম্বর মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। আর চেয়ারম্যান মাত্র দায়িত্ব নিয়েছেন, সিদ্ধান্ত নেবেন— এমন সুযোগ নেই, ট্রাস্টি বোর্ডে আরও সদস্য রয়েছেন।

উনি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন। ওনার সাথে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমার সাথেও রিসেন্টলি ফোনে কথা হয়েছে ওনার। ট্রাস্টির কয়েকজনের সাথে ওনার ফোনে কথা হয়। উনি কোনোদিন নেগেটিভ কথা বলেননি— ড. ফারাহনাজ ফিরোজ, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) চেয়ারম্যান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

পদত্যাগের বিষয়ে অধ্যাসপক ড. মো. মনিরুজ্জামান নিজে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাকে বলেন, আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিয়েন ছুটিতে স্টামফোর্ডে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই ছুটির মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি কাজের পরিবেশে কিছু অনিশ্চয়তাও তৈরি হচ্ছিল। সবকিছু বিবেচনা করে আগেই পদত্যাগ করেছি। এমনিতেও জানুয়ারিতে আমাকে দায়িত্ব ছাড়তেই হত।

পদত্যাগের পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ আছে কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না, রাজনৈতিক কোনো কারণ নেই। ২০০৮ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে আমি শিক্ষক রাজনীতি থেকে দূরে আছি। ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও করেছি। তারা চায়নি আমি পদত্যাগ করি, বরং আমাকে আটকাতে চেষ্টা করেছে।

ট্রাস্টি বা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দূরত্বের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেমন কোনো বিষয় না। চেয়ারম্যান অল্পবয়সী ও শিক্ষিত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চেষ্টা করছেন। তবে বেতন-ভাতা নিয়ে কিছু জটিলতা আছে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইউনূস মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে ফোন কেটে দেন। এরপর কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সড়া দেননি।

আমি যতটুকু জানি, বিশ্ববিদ্যালয়টার সামগ্রিক অবস্থা ভালো না। শিক্ষকদের অধিকার দেখা আমাদের কাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়টা যাতে ভালো অবস্থায় যায়, সেটা আমরা চেষ্টা করছি— অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য

বেতন-ভাতা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলা হলে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) চেয়ারম্যান ড. ফারাহনাজ ফিরোজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের তো সব প্রতিষ্ঠানের একটা সিস্টেম থাকে। সিস্টেম অনুযায়ী সবরকম কাজ হচ্ছে। এখানে আমাদের যেটা করার কথা, সেভাবেই সবকিছু করা হচ্ছে।

উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, উনি ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন। ওনার সাথে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমার সাথেও রিসেন্টলি ফোনে কথা হয়েছে ওনার। ট্রাস্টির কয়েকজনের সাথে ওনার ফোনে কথা হয়। উনি কোনোদিন নেগেটিভ কথা বলেননি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্টামফোর্ডের একজন শিক্ষক সম্পর্কে আমি নিজেই প্রচন্ড কনসার্ন। উনি বিদেশে চলে গেলে বেতন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আমরা একটা কমিটি করেছিলাম সেই কমিটির আলোকে ব্যাপারটা সমাঝোতা করা হয়েছে। দেখা গেছে যে, এভাবে খুব বেশি ইফেক্টিভ কোন রেজাল্ট আসে না। আমি যতটুকু জানি, বিশ্ববিদ্যালয়টার সামগ্রিক অবস্থা ভালো না। শিক্ষকদের অধিকার দেখা আমাদের কাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়টা যাতে ভালো অবস্থায় যায়, সেটা আমরা চেষ্টা করছি।