বিশ্বজুড়ে এখন টি-টোয়েন্টি লিগ হয়। এই মুহূর্তে যেমন বাংলাদেশে চলছে বিপিএল, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ আর দক্ষিণ আফ্রিকায় এসএ টোয়েন্টি। মার্চে ভারতে শুরু হবে আইপিএল, পাকিস্তানে পিএসএল। প্রতিটি লিগেরই কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যার ওপর ভর করে সমর্থকেরা সেটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ বলে থাকেন।
কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হওয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে কোনটি সত্যিকার অর্থেই সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ? ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট উইজডেন বলছে, জনপ্রিয়তায়, অর্থের ঝনঝনানি আর তারকার সমাহারে এগিয়ে থাকা আইপিএল সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ নয়। তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ আসলে কোনটি?
আদতে একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ ব্যক্তিভেদে দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কারও কাছে প্রতিযোগিতামূলক মানে হচ্ছে ঘন ঘন অঘটন, টানটান পয়েন্ট টেবিল, এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা। আবার কারও কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানে হচ্ছে মাঠের ক্রিকেটের গুণগত মান, যেখানে প্রতিভাবানদের আধিক্য, আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টির মতো অস্থির একটি সংস্করণ, যেখানে কয়েকটি ওভারই ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে—সেখানে একটি একক, সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আসলেই কঠিন।
এ জায়গায় দাঁড়িয়ে উইজডেন তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ কিন্তু পরিমাপযোগ্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা মাপার চেষ্টা করেছে। দলগুলোর শক্তির সমতা বা তারকাখ্যাতিকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে একটি টুর্নামেন্টজুড়ে ব্যাট ও বলের মধ্যে ভারসাম্য হিসেবে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টি-টোয়েন্টি লিগ হচ্ছে এমন, যে লিগে শুধু ব্যাটসম্যান বা শুধু বোলাররা নিয়মিতভাবে আধিপত্য বিস্তার করে না। একই সঙ্গে একতরফা ম্যাচও তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

উইজডেন মোট ১০টি লিগের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। লিগগুলো হচ্ছে আইপিএল (ভারত), দ্য হানড্রেড (ইংল্যান্ড), সিপিএল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), এলপিএল (শ্রীলঙ্কা), বিবিএল (অস্ট্রেলিয়া), আইএল টি–টোয়েন্টি (সংযুক্ত আরব আমিরাত), এসএ টোয়েন্টি (দক্ষিণ আফ্রিকা), বিপিএল (বাংলাদেশ), পিএসএল (পাকিস্তান) এবং এমএলসি (যুক্তরাষ্ট্র)। এই লিগগুলোতে নিয়মিত বিদেশি খেলোয়াড়েরা অংশ নেন। বিশ্লেষণের জন্য ২০২২-২৩ বিগ ব্যাশ মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কোন টুর্নামেন্টে সবচেয়ে ভালো ভারসাম্য দেখা যায়?
বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট তুলনা করলে ধারাবাহিকভাবে রান করা কতটা সহজ বা কঠিন ছিল, তার একটি ভালো ধারণা পাওয়া যায়। এই সময়কালে ২০২৫ আইপিএল ছিল সবচেয়ে বেশি রান হওয়া টুর্নামেন্ট, যেখানে ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫২.৩৯। এর পরেই ছিল ২০২৪ আইপিএল, যেখানে স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫০.৫৮।
তবে ব্যাটিংয়ের উল্টো চিত্র আইপিএলের বোলিংয়ে। ২০২৫ আইপিএলে বোলিং স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯.৮, যা বিশ্লেষণ করা ৩২টি টুর্নামেন্টের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ (অর্থাৎ বোলারদের উইকেট পেতে সময় লেগেছে বেশি)। যার অর্থ হচ্ছে, আইপিএলে ব্যাটসম্যানদেরই দাপট বেশি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ও আছে। আইপিএলে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ারের নিয়ম চালু আছে, যা দলগুলোকে কার্যত একজন অতিরিক্ত ব্যাটসম্যান খেলানোর সুযোগ করে দেয়। আইপিএলের ব্যাটিং-প্রধান লিগ হয়ে ওঠার পেছনে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ারের ভূমিকা আছে।
অন্যদিকে, ২০২৩ লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ছিল ১২০.২৮, যা ১০ লিগের সব আসরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আবার বোলিং স্ট্রাইক রেট ছিল ১৮.৮। দুয়ে মিলে যা দাঁড়িয়েছে, সেটা হচ্ছে লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে অনেক বেশি বোলার-বান্ধব। সুতরাং ভারসাম্যের দিক থেকে শ্রীলঙ্কার লিগও বেশ পিছিয়ে।
বাংলাদেশের বিপিএল বোলিংয়ের দিক থেকে আইপিএলের কাছাকাছিই—স্ট্রাইক রেট ১৯.৫। তবে ব্যাটিংয়ে অনেকটাই পিছিয়ে—স্ট্রাইক রেট ১৩৬। অর্থাৎ, বিপিএলও অনেকটা বোলিং বান্ধবই, ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
রান করা কতটা সহজ?
একটি প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বিচার করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংসে রান গড়ের পার্থক্য। যেসব লিগে দিন-রাতের ম্যাচ বেশি হয়, সেখানে শিশিরের কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে বল ধরতে অসুবিধা হয়, বড় রান তাড়া করা যায়।
আর দ্বিতীয় ইনিংসে যদি রান রেট বেশি হয়, তাহলে বোঝা যায় তাড়া করার পরিস্থিতি তুলনামূলক সহজ। আর দুই ইনিংসের ব্যবধান যদি কম হয়, তবে তা একটি বেশি ভারসাম্যপূর্ণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়—যদিও ম্যাচ কতটা কাছাকাছি ছিল, সেটি নির্ভর করে জয়ের ব্যবধানের ওপর।
২০২২-২৩ বিগ ব্যাশ শুরুর পর থেকে এই দশটি লিগে মোট ১,১৮১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ম্যাচ টাই হয়েছে, আর ৬৩টি ম্যাচ জিতেছে দলগুলো পাঁচ রান বা তার কম ব্যবধানে। এ জায়গায় দেখা যাচ্ছে, ওভারপ্রতি সবচেয়ে বেশি রান উঠেছে আইপিএলে, প্রথম ইনিংসে ৮.৯৪ রান করে, দ্বিতীয় ইনিংসে ৮.৮৩ করে। পার্থক্য ০.১১।
ওভারপ্রতি সবচেয়ে কম উঠেছে বিপিএলে। প্রথম ইনিংসে ৭.৫৯ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৭.৫৩ রান করে।
টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে ওভারপ্রতি রানের হার
| টুর্নামেন্টের নাম | প্রথম ইনিংসের রান রেট | দ্বিতীয় ইনিংসের রান রেট | ব্যবধান |
| ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ | ৮.৯৪ | ৮.৮৩ | ০.১১ |
| পাকিস্তান সুপার লিগ | ৮.৮১ | ৮.১৮ | ০.৬৩ |
| মেজর লিগ ক্রিকেট | ৮.৪৩ | ৮.২৮ | ০.১৫ |
| দ্য হান্ড্রেড | ৮.২১ | ৮.১৭ | ০.০৪ |
| ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ | ৮.০৩ | ৭.৯৪ | ০.০৯ |
| এসএ টোয়েন্টি | ৮.০১ | ৭.৭১ | ০.৩০ |
| বিগ ব্যাশ লিগ | ৭.৮৫ | ৭.৯১ | −০.০৬ |
| লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ | ৭.৭৩ | ৭.৯১ | −০.১৮ |
| আইএল টি-টোয়েন্টি | ৭.৬৯ | ৭.৮৪ | −০.১৫ |
| বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ | ৭.৫৯ | ৭.৫৩ | ০.০৬ |
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বোঝার আরেকটি মানদণ্ড হচ্ছে কত শতাংশ ম্যাচ খুব অল্প ব্যবধানে নিষ্পত্তি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অল্প ব্যবধান বলতে ৫ বা তার কম রানকে ধরা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি স্বল্প ব্যবধানের ম্যাচ হয়েছে ইংল্যান্ডের দ্য হানড্রেডে। সেখানে ৯৮টি ম্যাচের ১০টি বা ১০.২% শতাংশ ৫ বা তার কম রানের ব্যবধানে শেষ হয়েছে। তবে দ্য হানড্রেড পুরোপুরি টি-টোয়েন্টিও নয়। এটি মূলত ১০০ বলের খেলা, যদিও টি-টোয়েন্টি হিসেবে স্বীকৃত।
২০ ওভারের টি-টোয়েন্টি লিগ ধরলে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পাকিস্তানের পিএসএল। এই লিগের ৯৯ ম্যাচের ৮টি স্বল্প ব্যবধানে নিষ্পত্তি হয়েছে। আইপিএল এ ক্ষেত্রে ১০ লিগের মধ্যে তৃতীয় স্থানে (২১৬ ম্যাচে ১৫ বা ৬.৯৪%)। বিপিএলের অবস্থান অষ্টম। বাংলাদেশের লিগটির ১৫৭ ম্যাচের মাত্র ৪টি ৫ বা তার কম রানের ফলে শেষ হয়েছে (২.৫৫%)। বিপিএলের চেয়ে পেছনে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ টোয়েন্টি ও অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ।
উইজডেন বেশি রান তাড়ার বিষয়টিও বিশ্লেষণ করেছে। যদি কোনো লিগে নিয়মিতভাবে ১৮০-এর বেশি রান তাড়া করে জেতা যায়, তবে বোঝা যায় প্রথম ইনিংসে গড়ের চেয়ে বেশি করলেও তা নিরাপদ নয়। এর মাধ্যমে ব্যাটিং গভীরতা, আলোতে ব্যাটিংয়ের অনুকূল পরিবেশের বিষয়টি ফুটে ওঠার পাশাপাশি ‘ভালো স্কোর’ ও ‘জয়ের স্কোর’ এর মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনে।
টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের পরিসংখ্যান
| টুর্নামেন্টের নাম | ৫ রানের কম ব্যবধানে জেতা ম্যাচ | লিগের মোট ম্যাচ সংখ্যা | শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের হার (%) |
| দ্য হান্ড্রেড (ইংল্যান্ড) | ১০ | ৯৮ | ১০.২% |
| পিএসএল (পাকিস্তান) | ৮ | ৯৯ | ৮.০৮% |
| আইপিএল (ভারত) | ১৫ | ২১৬ | ৬.৯৪% |
| সিপিএল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) | ৬ | ৯৬ | ৬.২৫% |
| আইএল টি-টোয়েন্টি (আরব আমিরাত) | ৬ | ১০২ | ৫.৮৮% |
| এমএলসি (যুক্তরাষ্ট্র) | ৩ | ৫৬ | ৫.৩৬% |
| এলপিএল (শ্রীলঙ্কা) | ২ | ৬২ | ৩.২৩% |
| বিপিএল (বাংলাদেশ) | ৪ | ১৫৭ | ২.৫৫% |
| এসএ টোয়েন্টি (দক্ষিণ আফ্রিকা) | ৫ | ১৯৭ | ২.৫৪% |
| বিগ ব্যাশ (অস্ট্রেলিয়া) | ৪ | ১৬৯ | ২.৩৭% |
আবার, যদি ১৪০-এর আশপাশের স্কোর প্রায়ই ডিফেন্ড করা যায়, তবে বোঝায় যে বোলাররা বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
যদি দেখা যায় কোনো লিগে ১৮০ রান প্রায়ই তাড়া করা হয় কিংবা ১৪০ রানের পুঁজি বোলাররা রক্ষা করে ফেলেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে চিত্রিত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ১০টি লিগের সর্বশেষ আসরে মোট ৩৯ বার ১৮০ বা এর বেশি রান প্রতিপক্ষ সফলভাবে তাড়া করেছে। এর মধ্যে ১৫টিই আইপিএলে, যা ব্যাটসম্যানদের দাপটই ফুটিয়ে তোলে। পিএসএলে এমনটা দেখা গেছে পাঁচবার। এ ছাড়া বিগ ব্যাশে চারবার, এমএলসিতে আটবার, সিপিএলে পাঁচবার ১৮০ বা তার বেশি তাড়া করতে দেখা গেছে। দ্য হানড্রেড এবং বিপিএলে এমনটা দেখা গেছে মাত্র একবার করে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত (যা সব লিগের এক মৌসুমের সমান) মাত্র সাতবার ১৪০ ডিফেন্ড করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে পিএসএলে একবারও নেই।
মোটের ওপর যা দাঁড়াচ্ছে, ব্যাট-বলের ভারসাম্যের বিভিন্ন মানদণ্ড অনুসারে দ্য হানড্রেড এবং সিপিএলই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। আইপিএল, পিএসএল ব্যাটিং-বান্ধব, বিপিএল, এলপিএল বোলিংবান্ধব।