মোহামেডানের উজবেক ফুটবলার মোজাফফরভ দেশে ফিরে গেছেন মঙ্গলবার। পারিবারিক কারণে তাকে দেশে চলে যেতে হয়েছে। মোজাফফরভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারিবারিক কারণ তুলে ধরে লিখেছেন 'আমি মোহামেডানে সাড়ে চার বছর খেলেছি। অনেক ট্রফি জয় করেছি। এই ক্লাবে খেলে আমি গর্বিত। আমি ক্লাবের ফুটবলের পাতায় ইতিহাস লিখেছি। যেখানে আমার নামও থাকবে। সব কিছুর জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আমার পরিবারের জন্য মোহামেডান ছেড়ে দিচ্ছি। তবে মোহামেডানকে কোনো দিন ভুলব না।'
ক্লাব সূত্রে জানা গেছে মোজাফফরভ পারিবারিকভাবে দুঃসময় কাটাচ্ছেন। তার মা মারা গেছেন, বাবা একজন ফুটবল কোচ। কিন্তু তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। মোজাফফরভের দুই সন্তান, তার স্ত্রী সন্তানসম্ভাবা। পরিবারকে দেখার কেউ নেই। বাবা হাসপাতালে। প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে রহমতগঞ্জের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলেছেন মোজাফফরভ। আর গত ২৮ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে যান। গতকাল তার বাবার আরো একবার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। বাবা এমন এক পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন যে, তাকে ছুটি দিতেই হবে।'
ছাঈদ হাসান কানন জানালেন, মোজাফফরভ আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, লিগের ফিরতি পর্ব খেলতে পারবেন না। তার বাবার অসুস্থতার কারণে। বাবার অবস্থা মনে হয় খুব একটা ভালো নয়। আগেই মা মারা গেছেন, স্ত্রীও সন্তানসম্ভাবা, দেখার কেউ নেই। ফুটবল পাড়ায় গুঞ্জন মোজাফফরত ক্লাবের কাছে বকেয়া না পেয়ে চলে গেছেন। কথাটা উড়িয়ে দিলেন কানন। তিনি ক্লাবের ঘনিষ্ঠজনদের একজন। 'না না। বকেয়া না পেয়ে চলে গেছেন এমন নয়। মোজাফফরভ খেলতে পারবেন না, সেটি আগেই জানা। কোনো টাকা বকেয়া নেই, সব বেতন বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসি মুখে চলে গেছেন মোজারফফরভ-বললেন কানন।'
অন্য একটি সূত্রের দাবি- 'মোজাফফরভ ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তার বাবার শরীর খুব খারাপ। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, ছুটি না দিলে জোর করেই চলে যেতেন। মা মারা গেছেন, এখন বাবাও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। এমন অবস্থায় সন্তান হয়ে কীভাবেই বা বসে থাকবেন? খেলায় মন থাকবে না। মোজাফফরভ তার পরিবার কী অবস্থায় রয়েছেন, সে কথা আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। এখানে মানবিক কারণও তো রয়েছে।'
২০২২ সালে মোহামেডানের কোচ থাকাকালীন শফিকুল ইসলাম মানিকের হাত ধরে সাদাকালো ডেরায় যোগ দিয়েছিলেন উজবেকিস্তানের ফুটবলার মোজাফফরভ। সেই থেকে আর মোহামেডান জার্সি ছেড়ে যাননি। মাঝমাঠের এই ফুটবলার মোহামেডানের প্রাণভোমরা ছিলেন। মাঝমাঠ এক হাতে ধরে রেখেছিলেন। মোহামেডানের অনেক জয়ের পেছনের নায়ক ছিলেন তিনি। সুলায়মান দিয়াবাতের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল দারুন। দুই জনের শক্তি মেধা মোহামেডানের জয় উপহার দিয়েছে। ফেডারেশন কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। প্রথম বার প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল।
সুলায়মান দিয়াবাতে মোহামেডান ছাড়লেও মোজাফফরভছাড়েননি। মোজাফফরভের কর্নার, ফ্রিকিক প্রতিপক্ষের জন্য খুবই বিপদজ্জনক। একবার আবাহনীতে ধারে খেলেছিলেন। কিন্তু খেলা শেষে সাদা-কালোয় ফিরে এসেছেন। তার সামনে একাধিক বড় ক্লাবের অফার ছিল। কিন্তু মোহামেডানের প্রতি ভালোবাসার কারণে শত কষ্টের মধ্যেও মোজাফফরভ দল ছাড়ার কথা ভাবেননি। মোহামেডানের কোচিং স্টাফ এবং দলের ফুটবলারদের সঙ্গে মোজাফফরভের সখ্য সব সময় ছিল। বন্ধনটা ছিল শক্তপোক্ত। বকেয়া থাকলেও সহজে মুখ খুলতেন না।
লিগ চলাকালীন আচমকা মোজাফফরভের চলে যাওয়া নিয়ে ক্লাব ফুটবল পাড়ায় একটা নেতিবাচক কথা ভেসে বেড়ালেও অস্বীকার করছেন সবাই। ছাঈদ হাসান কানন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। মোজাফফরতের পজিশনে খেলার মতো ভালো এবং উঁচুমানের ফুটবলার নেই। মোহামেডানের বর্তমান দলে বিদেশি শক্তি বলতে একমাত্র নাম মোজাফফরভ।
মোজাফফরত চলে গেলেও এই মুহূর্তে দলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে মোহামেডান এখন ফিফার নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে। বিদেশি ফুটবলার রেজিস্ট্রেশন করাতে পারবে না। একজন বিদেশি ফুটবলারের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে ফিফা। সেই ফুটবলারকে ৭০ হাজার ডলার পরিশোধ না করা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে না। লিগের মাঝ বিরতিতে ফিফার খেলোয়াড় রেজিস্ট্রেশন উইনডো খোলা হয়। ৭০ হাজার ডলার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি টাকা পরিশোধ না করলে মোহামেডান নিষেধাজ্ঞায় পড়ে থাকবে।
মোহামেডান মনে করছে, লিগের মাঝ বিরতিতে লম্বা সময় খেলা বন্ধ থাকবে। মোজাফফরভ এর মধ্যে চলে আসবেন ঢাকায়। সমস্যা হচ্ছে আজকে লিগের ম্যাচ ব্রাদার্সের বিপক্ষে। মোজাফফরভকে ছাড়াই খেলতে হবে। একটা ম্যাচ কোনো রকমে শেষ করতে চায় মোহামেডান। তার আগ পর্যন্ত মহা বিপদেই থাকবে মোহামেডান।