বাংলাদেশের ক্রিকেটে আজকাল মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের ইস্যু নিয়ে মাতামাতি বেশি। মাঝে কে বা কারা গুজব রটিয়ে দিল যে প্রধান নির্বাচক পদে হাবিবুল বাশার থাকছেন না। তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার পরিবর্তে আরেকজনকে নতুন প্রধান নির্বাচক করা হচ্ছে।
যেহেতু জাতীয় দলের দিনকাল খারাপ, কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স, প্রাপ্তি হচ্ছে না। শনির দশা লেগেই আছে, যাচ্ছে না। তাই কেউ কেউ সেই স্রোতের জোয়ারে গা ভাসিয়ে খবরটা গ্রহণও করেছেন। কিন্তু এটা ভেবে দেখেননি যে হাবিবুল বাশার সুমনকে সরিয়ে দেওয়া হলে প্রধান নির্বাচকের চেয়ারে বসানো হবে কাকে?
আগের ধারাবাহিকতায় এমন কি কেউ আছেন, যাঁকে হাবিবুল বাশারের জায়গায় বসানো হলে কোনো কথা হবে না? তারপর কে হবেন চিফ সিলেক্টর?
এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে বাংলাদেশে গত প্রায় দুই যুগ ধরে রীতি হয়ে গেছে যে সাবেক কোনো অধিনায়কই হন প্রধান নির্বাচক। সেই রীতিতেই সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ, আকরাম খান ও মিনহাজুল আবেদিন নান্নু প্রধান নির্বাচক ছিলেন। তাদের পর চতুর্থ সাবেক জাতীয় অধিনায়ক হিসেবে প্রধান নির্বাচক হয়েছেন হাবিবুল বাশার সুমন।
খুব স্বাভাবিকভাবেই সুমনকে সরানো হলে তার জায়গায় জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ককে বসানো হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তিনি কে?
বলে রাখা ভালো, হাবিবুল বাশারের আগে অধিনায়ক ছিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট আর খালেদ মাহমুদ সুজন। পাইলট আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডে ছিলেন। সব হিসাব-নিকাশেই বর্তমান অবস্থায় বোর্ডের কোনো উচ্চ পদে পাইলটের আসীন হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আর খালেদ মাহমুদ সুজন নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ডের ডাকসাইটে পরিচালক।
বর্তমান বিসিবি প্রধান তামিম ইকবালের খুব কাছের জন। সুজনকে শ্রদ্ধা, সম্মান- দুই’ই করেন তামিম। তার বুদ্ধি ও পরামর্শও নেন। তবে সেটাও কোচিং লাইনে। সুজনও প্রধান নির্বাচক হওয়ার দৌড়ে কাজ করেননি কখনো। তাই তারও তামিমের বোর্ডে সুযোগ ছিল; কিন্তু তিনি তা হননি। এখনো নানা পর্যায়ে কোচিংয়ের সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন সুজন। তাই তারও প্রধান নির্বাচক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
এরপর জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। যিনি নির্বাচক পদের চেয়ে কোচিং করাতেই অধিক স্বচ্ছন্দবোধ করেন। কোচিং তার পছন্দও। এরই মধ্যে জাতীয় দলের সাবেক ব্যাটিং কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন আশরাফুল।
এরপর অধিনায়ক হয়েছেন মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মর্তুজা আর সাকিব আল হাসান। তাদের মধ্যে মাশরাফি আর সাকিবের এই আমলে প্রধান নির্বাচক তো বহুদূরে, জাতীয় দলের আশপাশে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
জাতীয় দলের অপর সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম এখনো খেলছেন। হয়তো জাতীয় দলে আরও বছর খানেক খেলবেন। তারপর ঘরোয়া ক্রিকেটও হয়তো আরও এক-দুই বছর উপভোগ করে খেলতে পারেন। তাই বলেই দেওয়া যায়, হাবিবুল বাশারের পরে যদি জাতীয় দলের কোনো সাবেক অধিনায়ক প্রধান নির্বাচক হন, সেটা হবেন মুশফিকুর রহিম।
তামিম ইকবাল তো নিজেই বোর্ডপ্রধানের চেয়ারে আসীন। তাই তার আর প্রধান নির্বাচক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সেদিক থেকে কেউ কেউ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের নামও বলতে পারেন। ক্রিকেটার হিসেবে রিয়াদ তো মুশফিকেরও সিনিয়র। পাশাপাশি রিয়াদও জাতীয় দলে অধিনায়কত্ব করেছেন। তাকেও তো হাবিবুল বাশারের পর প্রধান নির্বাচক করা হতে পারে। কিন্তু ওপরে রিয়াদের নাম আসেনি কেন- এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
আসেনি এই কারণে যে রিয়াদও কোচিংকেই ভবিষ্যতের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এরই মধ্যে বয়সভিত্তিক ও হাই পারফরম্যান্স ইউনিট-টাইপ দলের কোচিংয়ে জড়িয়ে গেছেন রিয়াদ। তাই তার প্রধান নির্বাচক হওয়ার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ।
প্রশ্ন উঠতে পারে, হাবিবুল বাশার সুমনের সিনিয়র ক্রিকেটার ও তার আগে জাতীয় দল পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া নাইমুর রহমান দুর্জয়ের নাম তো একবারও উচ্চারণ করা হলো না কেন?
দুর্জয় তো প্রথম টেস্ট অধিনায়ক। তার একটা আলাদা ইমেজও আছে। জানা আছে বলেই বলছি, বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক আদর্শের নাইমুর রহমান দুর্জয় এখন কারাবন্দী। মানিকগঞ্জের সংসদ সদস্য ও কয়েকবারের বিসিবি পরিচালক দুর্জয়ের এই আমলে বোর্ডে আসার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়।
একটু ভালো করে লক্ষ করুন, এই মুহূর্তে হাবিবুল বাশারের ধারে-কাছে নেই জাতীয় দলের আর কোনো সাবেক অধিনায়ক। ক্রিকেটার আছেন বেশ কয়েকজন। মোহাম্মদ রফিক, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ, জাভেদ ওমর বেলিম, সানোয়ার হোসেন, হাসিবুল হোসেন শান্ত ও পরের প্রজন্মের শামসুর রহমান শুভর মতো জনপ্রিয় ও নামী ক্রিকেটারদের মেধা ও প্রজ্ঞার প্রতি সম্মান রেখেই বলা, বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক পদে গত ২০ বছর অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাদের মধ্যে বাশারই শেষ অপশন।
এরপরের কাউকে প্রধান নির্বাচক করতে গেলে পাকিস্তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। পাকিস্তানে তো ওয়াহাব রিয়াজ-মার্কা ক্রিকেটাররাও প্রধান নির্বাচক হয়ে যান। বাংলাদেশে খুব বড় নাম না হলে আর সাবেক অধিনায়কের তকমা গায়ে না থাকলে চিফ সিলেক্টর হওয়া খুব কঠিন।
এসব বিবেচনায় বলা যায়, এই মুহূর্তে হাবিবুল বাশারের মান ও ইমেজের কেউই লাইনে নেই। কাজেই বলেই দেওয়া যায়, বর্তমান বোর্ড চাইলেও সহসাই হাবিবুল বাশারের প্রধান নির্বাচক পদ থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা খুব কম। তাকে বাদ দিয়ে প্রধান নির্বাচক পদে জাতীয় দলের সাবেক অন্য কোনো অধিনায়ককে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটাও সহজ নয়।
আর জাতীয় দলের কোনো অধিনায়কের বাইরে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটারের কাউকে প্রধান নির্বাচক করার অর্থ, চলমান রীতির বাইরে গিয়ে চিফ সিলেক্টর নিয়োগ দেওয়া। মানে, আগের বোর্ডপ্রধানরা যা করেননি, তা করা।
তামিম ইকবাল কি সেই রীতি ভেঙে নতুন পথে হাঁটার চেষ্টা করবেন?