ভাঙল বিশ্বরেকর্ড। ভাঙলেন জস বাটলার। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রানের রাজা এখন তিনিই। বাটলার পেছনে ফেলেছেন ওয়েস্টইন্ডিজের কাইরন পোলার্ডকে।
বুধবার ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ ম্যানচেস্টার সুপারজায়ান্টসের হয়ে ওয়েলস ফায়ারের বিপক্ষে ২০ বলে ৫১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন বাটলার। অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। সেই ইনিংসেই গড়েন বিশ্বরেকর্ড।
পোলার্ডকে পেছনে ফেলতে দরকার ছিল ২২ রান। মার্কো ইয়ানসেনকে টানা তিনটি ছক্কা মারার প্রথমটিতেই পোলার্ডের ১৪,৮০৩ রানের মাইলফলক পেছনে ফেলেন বাটলার। টি-টোয়েন্টিতে বাটলারের রান এখন ১৪৮৩৩। পোলার্ডের রান ১৪৮০৩। ক্রিস গেইল এই তালিকায় তিনে রয়েছেন ১৪৫৬২ রান নিয়ে।
ম্যাচ শেষে স্কাই স্পোর্টসকে বাটলার বলেন, ‘অন্য যে কারও চেয়ে বেশি টি-টোয়েন্টি রান করেছি-এটা ভাবা আসলেই অসাধারণ। একদিন হয়তো কেউ এই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে তবে এটি ভীষণ গর্বের এক মুহূর্ত। এই তালিকায় অনেক বড় বড় ও বিশেষ কিছু ক্রিকেটারের নাম আছে, তাই আমি ভীষণ গর্বিত।’
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) ট্রিনবাগো নাইট রাইডার্সের হয়ে বাটলারকে আবার ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন পোলার্ড। তালিকার চারে থাকা অ্যালেক্স হেলসের সামনেও সুযোগ থাকবে। তবে পোলার্ড ধীরে ধীরে কোচিংয়ে মনোযোগ দেওয়ায় খুব বেশি দূর যাওয়ার সুযোগ কম তার।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আট ইনিংসে বাটলার করেন মাত্র ৮৭ রান। তবে এখন নিজেকে ফিরে পাওয়ায় খুশি ইংল্যান্ডের এই তারকা,‘ক্রিকেট কত দ্রুত বদলে যায় তা দেখলে হাসি পায়। একদিন আপনি ওপরে তো পরদিনই নিচে! কয়েক মাস আগেও আমি রান পাচ্ছিলাম না, আর বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহে মনে হচ্ছে আমি জীবনের সেরা ব্যাটিংটা করছি। আপনার কাছে কেবল দুটি পথই খোলা থাকে, হয় আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে, নয়তো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার মতো শক্তি জমাতে হবে। আমার মধ্যে সেই শক্তি ও জেদ ছিল বলেই আমি আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছি।’
শুরুর দিনগুলো যেমন ছিল
বাটলারের এই গল্পের শুরুটা হয়েছিল ভারতের হায়দরাবাদে। ২০০৯ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ টি-টোয়েন্টিতে সমারসেটের হয়ে অভিষেক হয়েছিল ১৯ বছরে পা দেওয়া বাটলারের। নিউ সাউথ ওয়েলসের বিপক্ষে দলের ৯ নম্বর ব্যাটার হিসেবে তিনি উইকেটে আসেন। সেই ম্যাচে করেছিলেন ৬ রান।
এর প্রায় দুই বছর পর ম্যানচেস্টারে ইংল্যান্ডের হয়ে তার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক। নিজের প্রথম চারটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের তিনটিতেই তিনি ব্যাট করার সুযোগ পাননি!
শুরুটা হয়েছিল ধীরগতিতে। তবে ইংল্যান্ডের সাবেক সতীর্থ ডেভিড মালান জানান, বাটলারের অসাধারণ প্রতিভা সব সময়ই ছিল।
মালান বললেন, ‘সে খুব অল্প বয়সে শুরু করেছিল। তার স্কুপ শট খেলার ক্ষমতা এবং পাওয়ার-হিটিং সব সময়ই ছিল, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ক্রিকেটের চাহিদার সঙ্গে সে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। সে কখনোই পিছিয়ে পড়েনি।’
ইংল্যান্ডের হয়ে বাটলারের প্রথম ফিফটি আসে ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। তবে নিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরির জন্য ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শারজায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৭ বলে সেঞ্চুরি করেন তিনি।
বছরের পর বছর রানের ক্ষুধা
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাটলার অসাধারণ ধারাবাহিক। গত ১২ বছরে কেবল একবার (২০১৭) তার ব্যাটিং গড় ৩০-এর নিচে ছিল। ২০২১ সাল থেকে তিনি ক্যারিয়ারকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার ৯টি টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরির সবগুলো এসেছে এই সময়ে।
ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন ইনিংসের শেষের দিকের হিটার। ওপেনিংয়ে নামার পর তার রানের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাওয়ারপ্লেতে তার রেকর্ড অবিশ্বাস্য। প্রথম ৬ ওভারে তার ব্যাটিং গড় ৪৩। টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ারপ্লেতে ১,০০০-এর বেশি রান করা ইংলিশ ব্যাটারদের মধ্যে কেবল দুজন তার চেয়ে বেশি গড়ে রান তুলেছেন (টম ওয়েস্টলি ও কেভিন পিটারসেন)।
ডেথ ওভার পর্যন্ত টিকে থাকলে আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠেন বাটলার। ইনিংসের শুরুতে তার স্ট্রাইক রেট ১৪৩ হলেও ১৬ থেকে ২০ ওভারে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪-তে।
অথচ তার ব্যাটিং কৌশল খুবই সহজ। এ নিয়ে মালান বলেন, ‘জস বাটলারের মূল দর্শন হলো অফ-সাইডে বল মারা। বিশেষ করে ডেথ ওভারে সে সব সময় সাইটস্ক্রিনে সোজাসুজি বল মারার চেষ্টা করে। এটি কিছুটা অদ্ভুত, কারণ সাধারণত এই সময়ে ব্যাটাররা বল উঁচিয়ে মাঠের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করে। সে দুটি জিনিসে বিশ্বাস করে-সাইটস্ক্রিনে মারা আর নিজের অবস্থান ঠিক রাখা। সে নিজের শরীরের নিচের অংশ (বেস) এত মজবুত পজিশনে রাখে যে সহজেই বলের লাইনে হাত চালাতে পারে।’
ইংল্যান্ডের সাবেক ফাস্ট বোলার স্টিভেন ফিন বাটলারের কব্জির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে বললেন, ‘নেটে প্রথমবার যখন আমি তাকে বল করেছিলাম, তার ব্যাটে বল লাগার শব্দটাই ছিল আলাদা। কাভার ড্রাইভ বা সোজা ছক্কা মারার সময় সে যেভাবে কব্জি ঘুরায় ও হকি শটের মতো ফ্ল্যাট হিট করে-তার কব্জির জোর অন্য যে কোনো ব্যাটারের চেয়ে তাকে আলাদা করে তোলে।’