মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে তখন উৎসব, উন্মাদনা। স্পেনের ফুটবলাররা বিশ্বকাপ ট্রফি ঘিরে আনন্দে মাতোয়ারা। অন্য প্রান্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। সবুজ ঘাসের উপর একা বসে আছেন লিওনেল মেসি। সামনে খুলে রাখা বুট আর শিনগার্ড, দুই হাতের ভর দিয়ে পেছনে হেলান দিয়ে নির্বাক তাকিয়ে আছেন গ্যালারির দিকে। ফিফা’র স্বেচ্ছাসেবকরা ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরিতে ব্যস্ত। তাদের একজন মেসিকে সরে যেতে ইশারা করলেও তিনি যেন কিছুই দেখলেন না। তার দৃষ্টি তখন পরিবারের সদস্যদের খুঁজে ফিরছে দর্শকাসনে। টেলিভিশনের ক্যামেরায় বারবার ধরা পড়ছিল সেই নিঃশব্দ বেদনার ছবি।
আর্জেন্টিনা মাঠে নেমেছিল আরেকটি ইতিহাস লেখার স্বপ্ন নিয়ে। লক্ষ্য ছিল পেলের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দু’টি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। পুরো ম্যাচে একটি লক্ষ্যভেদী শটও নিতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। অন্যদিকে স্পেন ১২টি শটের একটিকে জালে পাঠিয়েই নিশ্চিত করে শিরোপা। ম্যাচ শেষে হতাশ স্কালোনি বলেন, ‘আমরা ভীষণ হতাশ। আমাদের সমর্থকদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা শেষ পর্যন্ত আমাদের শক্তি জুগিয়েছে। ম্যাচটি ছিল উন্মুক্ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা পারিনি। স্পেনই জয়ের যোগ্য ছিল। এটাই বাস্তবতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের মুহূর্ত থেকেই আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসতে হয়। নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে আবার শুরু করতে হবে।’ কিন্তু সেই নতুন শুরুর পথে কি থাকবেন লিওনেল মেসি? ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার শিরোপা, মাঝখানে ২০২২ বিশ্বকাপ- গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা ছিল আধিপত্যের প্রতীক। ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল চার আসরের মধ্যে তাদের তৃতীয় ফাইনাল। মেসির জন্য এই ম্যাচের আবেগ ছিল আরও গভীর। কারণ স্পেনেই কেটেছে তার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় সময়। বার্সেলোনার জার্সিতে সেখানেই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে। তাই মেটলাইফের এই হার যেন ব্যক্তিগতভাবেও এক বেদনাময় অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাহলে কি এটাই বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ ম্যাচ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিলেন তিনি। শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে করেন গুরুত্বপূর্ণ সমতাসূচক গোল। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দেন দুর্দান্ত দু’টি অ্যাসিস্ট। পুরো টুর্নামেন্টে তার ঝুলিতে জমা পড়ে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে ১০ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জিতে নেয়ায় ব্যক্তিগত সেই সম্মান অল্পের জন্য হাতছাড়া হয় মেসির। তবে ফাইনালের গল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের পায়ে। ফলে ম্যাচ জুড়ে আর্জেন্টিনাকে ছুটতে হয়েছে প্রতিপক্ষের পেছনে। টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোতে যেভাবে খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন মেসি, ফাইনালে আর সেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার পরিসংখ্যানই বলে দেয় এক অনন্য কীর্তিগাথা- ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, একটি বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা এবং একটি ফিনালিসিমা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন সাফল্য খুব কম খেলোয়াড়ই অর্জন করতে পেরেছেন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে এই পরাজয়ের মধ্যদিয়েই হয়তো আলবিসেলেস্তেদের হয়ে নিজের শেষ অধ্যায় লিখে ফেললেন মেসি। এখনো তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি। কিন্তু ট্রফিহীন এই বিদায়ই হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ উপস্থিতি হয়ে থাকবে। কারণ পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে ২০৩০ সালে। তখন মেসির বয়স হবে ৪৩। সেই বয়সে বিশ্বকাপ খেলা বাস্তবতার বিচারে প্রায় অসম্ভব। অবশ্য ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা তুলনামূলকভাবে কাছেই। সেখানে তাকে আবারো আকাশি-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে কিনা, সেটি নির্ভর করবে তার শারীরিক সক্ষমতা, ফিটনেস এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে একটি বিষয় নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি যা অর্জন করেছেন, তা শুধু পরিসংখ্যান নয়- এটি একটি প্রজন্মের আবেগ, একটি দেশের গর্ব এবং ফুটবল ইতিহাসের এক অমর মহাকাব্য।