কথাটা উঠেছে ঠাট্টাচ্ছলে: মেসি কি ২০৩০ বিশ্বকাপেও খেলবেন? তার সতীর্থ খেলোয়াড়রা হালকা চালে বলেছেন, মেসিকে তারা পরের বিশ্বকাপেও টিমে পেতে চান। কথার কথা। নিছক ভক্তিগীতি। সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু এই বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী মেসির পারফরমেন্স দেখে কথাটা একটু সিরিয়াসলিই উঠতে শুরু করেছে। গোল্ডেন বল এবং বুটের দৌড়ে তিনি এই আসরের তরুণ তুর্কিদেরও যেভাবে পিছনে ফেলে দিয়েছেন, আর যেভাবে অষ্টাদশ বর্ষীয়দের মতো ড্রিবল করছেন, তাতে অনেকেই মনে করছেন, বয়স মেসির ওপর কোনো আছড় ফেলতে পারছে না। সে কারণে ঠাট্টাচ্ছলে হালকাভাবে বলা কথাটা এখন আর ততটা হালকা শোনাচ্ছে না।
ইংল্যান্ডের সাবেক সেন্টার ব্যাক রিও ফার্দিনান্দ তো তার ব্লগে বলেই বসেছেন, মেসি চাইলে অনায়াসে ২০৩০ বিশ্বকাপে হোল্ডিং মিডফিল্ডার বা নাম্বার ৮ পজিশনে খেলতে পারেন। মেসির দীর্ঘদিনের বন্ধু লুইস সুয়ারেস বলেছেন, পরের বিশ্বকাপ নিয়ে মেসির সঙ্গে তার কথা হয়েছে। মেসি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। হাভিয়ের মাসচেরানোও বলেছেন, মেসির ক্ষেত্রে কোনো কিছুই অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া উচিৎ না।
২০৩০ বিশ্বকাপের একটা প্রতীকী গুরুত্ব আছে। এটি হবে বিশ্বকাপের শতবর্ষ। তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে এর আসর বসবে, যার মধ্যে আর্জেন্টিনাও আছে। মেসি যদি সেই আসরে খেলতে নামেন, তবে তা শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ হয়ে থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্ত।
কথা হলো, সেই বিশ্বকাপে মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর। এত বেশি বয়সে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার তেমন রেকর্ড নেই। এটা ঠিক যে ২০১৮ বিশ্বকাপে মিসরীয় গোলকিপার এশাম এল হাদারি যখন মাঠে নেমেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ৪৫ বছর। আর ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার গোলকিপার ফারিদ মনদ্রাগন ৪৩ বছর বয়সে হাতে গ্লাভস তুলে নিয়েছিলেন। তবে লক্ষ্য করুন, এরা দুজনেই গোলরক্ষক। কেউ আউটফিল্ডার নন, যাদেরকে মাঠ জুড়ে দৌড়ে বেড়াতে হবে। বিশ্বকাপে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ডার আমরা পেয়েছি ক্যামেরুনের রজার মিল্লাকে। ১৯৯৪ সালে ৪২ বছর বয়সে মাঠে নেমে একখানা গোলও করেছিলেন তিনি। তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপেই ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আমাদের চোখের সামনে। লুকা মদরিচেরও বয়স হয়েছে ৪০ বছর।
পরিস্থিতি বলছে, যতই অনুরোধের জোয়ার উঠুক, ফুটবলে এত বিপুল অর্জনের পর ৪৩ বছর বয়সে আবার মাঠে নামতে মেসি কিছুতেই রাজি হবেন না। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়, কথাটা উঠবে। দাবি উঠবে। জোরালোভাবে। বিশেষ করে মেসির হাতে আরেকবার বিশ্বকাপ শিরোপা উঠলে তো ফুটবল পণ্ডিতরা নিশ্চিতভাবে বিশ্লেষণে বসে যাবেন, ৪৩ বছর বয়সী মেসির জন্য কোন পজিশন সবচেয়ে জুতসই হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, বয়স্ক মেসির এবারের ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ খেলাই অনিশ্চিত ছিল। তিনি চাইছিলেন না। ২০২২ সালে বিশ্বকাপের শিরোপা হাতে নেওয়ার পর মেসি একপ্রকার বিদায়ই জানিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সিকে। বড়জোর কোপার আসর পর্যন্ত তাকে থাকতে রাজি করানো যেতে পারে বলে মনে হয়েছিল। মাঝখানে একবারের জন্যেও তার মুখ থেকে স্পষ্ট বার্তা আদায় করা যায়নি যে তিনি খেলছেন। এমনকি গত বছরও তাকে যখন এবারের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার জবাব ছিল: ‘আমার বয়সের কারণে সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাপার হলো আমার পক্ষে এটা সম্ভব হবে না।’ সেই মেসিকে ষষ্ঠ পেরিয়ে সপ্তমবারের বিশ্বকাপে নামাতে রাজি করানো যে সহজ হবে না, তা বলাই যায়।
কথা হলো, বয়স চল্লিশ পেরোলে বিশ্বকাপের আসরে অবতীর্ণ হওয়া কেন এত অসম্ভব হয়ে ওঠে? কেন বয়স এক দুর্লঙ্ঘ দেয়াল হয়ে দেখা দেয় ফুটবলারদের সামনে?
ফুটবলে বহুদিন ধরে বয়সের একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছে। বলা হয়, ২৭ থেকে ৩০ বছর হলো একজন ফুটবলারের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সের সময় বা পিক টাইম। ৩০ থেকে ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত ধীরে ধীরে তার পারফরমেন্সের অবনমন শুরু হয়। ৩৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সেও উচ্চমানের খেলা সম্ভব, তবে সেটা শর্তসাপেক্ষ। এর জন্যে বিপুল যত্ন ও শারীরিক সক্ষমতা দরকার। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সের পর অধিকাংশ আউটফিল্ড খেলোয়াড় হয় কম প্রতিযোগিতামূলক লিগে চলে যান, নয়তো অবসর নেন। ৩৫ বছরকে দীর্ঘদিন ধরে এলিট ফুটবলের অলিখিত ‘কাচের ছাদ’ বলে মনে করা হয়েছে। এটা এক অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা। মেসি কিংবা রোনালদো সেই সীমা ছাড়িয়ে এসেছেন বলে সেটা নেই বলা যাবে না। তারা শুধুই ব্যতিক্রম।
কিন্তু কেন ৩৫? এইখানে আসে শরীরবিদ্যা বা বিজ্ঞানের ব্যাপার। দেখা যায়, ৩৫ বছর বয়সের পর একসঙ্গে কয়েকটি জৈবিক পরিবর্তন শুরু হয়। এ বয়স থেকে ‘ভিও-টু ম্যাক্স’ বা শরীরের অক্সিজেনকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে দীর্ঘ দৌড়, দ্রুত রিকভারি, উচ্চ গতির প্রেসিং কঠিন হয়ে যায়। বয়স বাড়লে ফাস্ট-টুইচ মাংসপেশি শিথিল হতে শুরু করে। তখন দুম করে গতি বাড়ানো সম্ভব হয় না।
এক ম্যাচে শরীর নিংড়ানো শ্রমের পর পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়া বা রিকভারির জন্য কতটা সময় লাগছে, ফুটবলে সেটা একটা বড় ব্যাপার। ২০ বছর বয়সে ৭২ ঘণ্টায় এই রিকভারি সম্ভব। কিন্তু ৪৩ বছর বয়সে এটা অনেক বেশি সময় নেবে। বিশ্বকাপে ৩-৪ দিনের মধ্যে পরবর্তী ম্যাচের জন্য মাঠে নামতে হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, একজন শীর্ষ মিডফিল্ডার একটি ম্যাচে গড়ে ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ান। তার মধ্যে ৫০ থেকে ১০০ বার তিনি উচ্চ তীব্রতার দৌড় বা স্প্রিন্ট দেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উচ্চ-তীব্রতার দৌড়ের সংখ্যা বয়সের সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত কমে আসে। তার ওপর ৯০ মিনিট ধরে একই রকম ৩০ থেকে ৪০টি স্প্রিন্ট দিতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়।
ফুটবলের ক্ষেত্রে আরেকটি বিশেষ সমস্যা আছে। ধরুন, একজন টেনিস খেলোয়াড় বছরে ১৮ থেকে ২০টি টুর্নামেন্ট খেলেন। একজন গলফার আরও কম। কিন্তু একজন শীর্ষ ফুটবলার এক মৌসুমে ৫০ থেকে ৬৫টি ক্লাব ম্যাচ, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। এর সঙ্গে ভ্রমণ ও অনুশীলন মিলিয়ে প্রায় ১১ মাস তিনি উচ্চ পর্যায়ে শারিরীক সক্রিয়তার মধ্যে থাকেন। ফলে বিশ্বকাপ খেলতে হলে শুধু এক মাস ভালো থাকলেই হবে না। আগের তিন-চার বছর ধরে এই সূচি সামলাতে হবে।
এসব কারণে বেশি বয়সী আউটফিল্ড ফুটবলার আমরা এ খেলার সর্বোচ্চ আসরে দেখি না। শুধু ফুটবল কেন, শারীরিক শক্তি আর ক্ষিপ্রতা প্রয়োজন এমন যে কোনো খেলার ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে। টেনিসের কথা ধরা যাক। রজার ফেদেরার ৪১ বছর বয়স পর্যন্ত খেলেছেন বটে, কিন্তু ৩৭ বছরের পর আর কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেননি। জোকোভিচ ৩৭ বছর ৩ মাস বয়সে ইউএস ওপেন জিতে তার জয়রথ থামিয়েছেন।
তবে এটা ঠিক যে ৪০ পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট খেলতে আমরা অনেক ক্রিকেটারকেই দেখেছি। ৫০ এর পরেও ভালো গলফ খেলোয়াড়ের দেখা মিলবে। এর কারণ, এসব খেলায় শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে প্রিসিশন ও মনোযোগ বেশি জরুরি। এ রকম আরও কিছু স্পোর্ট হলো শ্যুটিং বা তির চালনা, অশ্বারোহণ।
দাবা যেহেতু মগজের খেলা, আমরা ভাবি অন্তত এ খেলায় আমরা বয়স্ক চ্যাম্পিয়ন পাব। অথচ আধুনিক যুগে দাবায় দেখা যাচ্ছে, ২০ থেকে ৩৫ বছরই সোনালি সময়। দাবার প্রায় সব বিশ্বচ্যাম্পিয়নই প্রথম শিরোপা জিতেছেন ২২ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। একমাত্র বিশ্বনাথন আনন্দ ৩৭ বছর বয়সে মুকুট পরেছেন। তিনি ছাড়া চল্লিশোর্ধ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এ যুগে কেউ নেই।
কেন এরকম? কারণ দাবায় গুরুত্বপূর্ণ হলো প্যাটার্ন রিকগনিশন বা দ্রুত প্যাটার্ন শনাক্ত করার ক্ষমতা, যেটা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করে। এছাড়া দ্রুত হিসাব করার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতাও কমতে থাকে।
তবে মনে রাখতে হবে, এতক্ষণ যা বলা হলো, সেগুলো সবই গড় খেলোয়াড়দের জন্য প্রযোজ্য। মেসি দেখিয়েছেন তিনি গড় কেউ নন। তিনি ব্যতিক্রম। সব রকম রেকর্ড ও নজির ভেঙে ৪৩ বছর বয়সে তিনি যদি বিশ্বকাপের আসরে নামেন, সেটা পুরো ক্রীড়াঙ্গণের ইতিহাসে অত্যাশ্চর্য ঘটনা হবে বটে, কিন্তু একেবারে অসম্ভব হবে না। তবে ওই বয়সের মেসির খেলার ধাঁচ অনেকখানি যে বদলে যাবে, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। বলতে কী, গত দশ বছর ধরে মেসি ক্রমাগত তার খেলার ধরন বদলেছেন। বেশি বয়সে ওয়াকিং ফুটবল নামে ফুটবল খেলার একটা নতুন ধারা তার হাত ধরেই সৃষ্টি হচ্ছে। খেলার মাঠে মস্তিষ্কের ব্যবহার তিনি ক্রমাগত বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মেসি ২০৩০ সালে মাঠে নামবেন, তাকে কোচ সবকটি ম্যাচে শুরুর একাদশে রাখবেন না। আর যেসব ম্যাচে তিনি মেসিকে খেলাবেন, সেখানেও শেষ ২০ থেকে ৩০ মিনিট আমরা তাকে মাঠে পাব। তাকে আমরা দেখব সেটপিস স্পেশালিস্ট হিসেবে। মেসির কাজ হবে খেলা পতিপথ বদলে দেওয়া, অনেকটা আমেরিকায় বাস্কেটবলের সবচেয়ে বড় লীগ এনবিএ-এর ভ্যাটেরান ইমপ্যাক্ট প্লেয়ারদের মতো, যারা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্যে মাঠে নেমে খেলার গতি বদলে দেন।
মানুষের সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ফরাসি কবি র্যাবো বিশ বছর বয়সে সাহিত্যকে বদলে দিয়েছিলেন। আবার রবীন্দ্রনাথ সত্তর পেরিয়ে নতুন ধরনের কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, আঁকতে শুরু করেছিলেন ছবি অদ্ভুত সব ছবি। খেলাধুলায় শরীরকে ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় না। মেসি যদি ৪৩ বছর বয়সে বিশ্বকাপে নামেন, তবে তিনি নিশ্চিতভাবেই ২২ বছরের মেসি থাকবেন না। কিন্তু ফুটবলের মাঠে নিজের পথ তিনি ঠিকই উদ্ভাবন করে নেবেন।