নিজের অবসর নিয়ে সমালোচনা ও জল্পনাকল্পনার জবাবে বরাবরের মতোই চড়া সুরে গর্জে উঠলেন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে সমালোচকদের এক হাত নিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিজের বিদায়ের সিদ্ধান্তটা তিনি নিজেই নেবেন, কারো চাপে পড়ে নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে ডালাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ৪১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ‘আমি যখন চাইব তখনই অবসর নেব, যেমনটা আমি বহু বছর আগেও বলেছি, আপনারা যখন চান তখন নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে রোনালদোর বয়সের কারণে এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বেশ বিরক্ত হন সিআরসেভেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা সবসময় আমাকে একই প্রশ্ন করেন, ‘শেষ বিশ্বকাপ’, এটা সময়ের অপচয়... দেখা যাক। আমি এই বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগামীকালের ম্যাচটি খেলা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে আমরা পরের পর্বে যাব।’
চলতি বিশ্বকাপেও ইতোমধ্যে তিনটি গোল করা সত্ত্বেও প্রথম একাদশে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নানা সমালোচনা চলছে, তবে এসবের বিন্দুমাত্র পরোয়া করেন না তিনি। রোনালদো আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘আমি অতটাও খারাপ খেলছি না। আমি এর মধ্যেই তিনটি গোল করে ফেলেছি; অন্যরাও এর চেয়ে বেশি গোল করেছে কারণ তারা খুব ভালো খেলছে। আপনারা হয়তো আমাকে আর এখানে দেখতে চান না, কিন্তু সেই সময়টাও আসবে। আমি আমার সর্বস্ব দিয়েছি। আমি আবেগের বশে খেলি, আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি বলেই খেলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জীবনে আমার কোনো কিছুর অভাব নেই; জীবন আমার প্রতি খুবই উদার। বিশ্বকাপ জিতব কি না, তাতে আমি আরও বড় ক্রিস্টিয়ানো হয়ে যাব না। আমি প্রতিদিনটা উপভোগ করার চেষ্টা করি, আর সমালোচনার মধ্য দিয়েই মানুষ আরও পরিণত হয়।’
পর্তুগিজ এই কিংবদন্তি সংবাদ সম্মেলনে শুরু থেকেই ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক মেজাজে। পেছনের সারিতে বসা এক সাংবাদিকের দিকে ইশারা করে তিনি স্বভাবসুলভ ঔদ্ধত্যের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, ‘ঐ যে লোকটা… একটা ভালো প্রশ্ন করে দেখাও তো। আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না।’ তার এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা হতবাক হয়ে যান।
তবে টিএনটি স্পোর্টস ব্রাজিল এবং ফোলা দে সাও পাওলোর সাংবাদিক মার্সেলো বেকলার দ্রুতই সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রশ্ন করেন, ‘৪১ বছর বয়সে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন বিষয় কোনটা?’ পর্তুগিজ অধিনায়কও বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তার স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ জবাবে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনাদের সাথে কথা বলা, যারা আমাকে পছন্দ করেন না, আর আমি জানি, আপনারাও তাদেরই একজন।’
সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে রোনালদো লাতিন আমেরিকার ফুটবল ভক্তদের প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যা থেকে যায় তা হলো মানুষ: যারা আপনাকে ভালোবাসে এবং যাদের জীবনে আপনি একটি ভিন্ন মুহূর্ত উপহার দিতে পারেন। আমি প্রায়ই সেখানকার কর্মীদের এবং ল্যাটিনোদের সাথে হোটেল শেয়ার করে নিই। আর আমার কাছে, সেগুলো অসাধারণ স্মৃতি।’
এরপরই তিনি টেক্সাস সফরের ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া এক মজার অভিজ্ঞতার গল্প শোনান। রোনালদো বলেন, ‘আপনারা আর্জেন্টিনার কথা বললেন, আর গতকাল ফ্লাইটে একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ছিলেন আর্জেন্টাইন, এবং তিনি যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, তা দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি আর্জেন্টাইন। আমি তাকে বললাম, ‘আপনি যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, তাতে আমি নিশ্চিত যে আপনি আর্জেন্টিনারই লোক। আপনি আমার দিকে তাকিয়ে খুব তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলেন। তার মানে আপনি ক্রিস্টিয়ানোকে পছন্দ করেন না, হা।’ কিন্তু এটা একটা মজা ছিল।’
লিওনেল মেসির দেশের প্রতি নিজের এই টানের পারিবারিক কারণ ব্যাখ্যা করে হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী আর্জেন্টাইন। স্বাভাবিকভাবেই, আর্জেন্টাইনদের প্রতি আমার অনুরাগ থাকবে। সেজন্য সব ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে নিজের ‘শেষ বিশ্বকাপ’ শব্দবন্ধটি আবার শুনে রোনালদো মুচকি হাসেন এবং একজন সত্যিকারের লিভিং লেজেন্ডের মতো শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘শেষ বিশ্বকাপ… প্রশ্নটার জন্য ধন্যবাদ, এটা বেশ মজার, আমার ভালো লাগছে। এটাই যেন আমার শেষ বিশ্বকাপ হয়, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ হবে… আমি দিন দিন এটা উপভোগ করব।’
সবশেষে পর্তুগালকে বিদায় দেখতে চাওয়া সমালোচকদের খোঁচা দিয়ে রসিকতার ছলে তিনি বলেন, ‘আশা করি কাল আমার শেষ ম্যাচ নয়, যাতে আপনারা আমাকে আরেকটু মেরে ফেলতে পারেন। আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করুন।’